শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us
আরাফাত,হিরো ও গনতন্ত্র কেউই জিততে পারেনি

হিরো আলমদের দাবড়ালে নির্বাচনও দৌড়ায়ঃগণতন্ত্র হোঁচট খায়

মনোয়ারুল ইসলাম   |   শুক্রবার, ২১ জুলাই ২০২৩   |   প্রিন্ট   |   ২৭২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

হিরো আলমদের দাবড়ালে নির্বাচনও দৌড়ায়ঃগণতন্ত্র হোঁচট খায়

 

হিরো আলমরা দাবাড় খেলে নির্বাচনও দৌড়াতে শুরু করে। গণতন্ত্র হোঁচট খায়। প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পায় না। আর সংবিধানের মৌলিক নীতিমালা মুখ থুবড়ে পড়ে। বাংলাদেশের ভবিষৎ অন্যদের হাতে গড়াগড়ি খায়। পবিত্র সংবিধানের ১৯(১),(২), ২৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হবেন। মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। ’ জাতীয় সংসদের ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচন নিয়ে যা বলা হলো ও করা হলো তা কি আমাদের পবিত্র সংবিধানের সাথে যায়? যারা প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্যের মতো প্রতিনিধির সাথে হিরো আলমরা যায় না। রুচিতে বাধে। তারা কি সংবিধানের উল্লেখিত ধারাগুলোকে রুচির সাথে পড়েছেন? বরং হিরো আলমের মতো মানুষেরা সংসদে গেলে সংবিধানের এই ধারাগুলোকেই সন্মানিত করতো।
ভারতের ফুলন দেবির কথা নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। গণ ধর্ষিতা, নিম্ন বর্ণ ও গোত্রের অস্পৃশ্য ফুলন দেবি ভারতীয় আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন । তাও প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে। তখনও কুলজাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বংশীয় রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিরা। যুক্তরাষ্ট্রে যখন বাদাম চাষীর সন্তান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন গণতন্ত্র ভয়ে পালিয়ে যায় না। রুচির প্রশ্ন ওঠে না। বরং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকারকে পোক্ত করে। বাংলাদেশের কতিপয় রাজনীতিবিদ, কথিত বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক কিংবা আর্টিস্ট হিরো আলমের রুচি নিয়ে যখন প্রশ্ন তোলেন তখন তারা নীচের দিকে তাদের বাপ দাদার খতিয়ানটি পর্যন্ত দেখেন না। দেখতে পাবেন কেন? তারা শুধু দেখেন কিছু পাবার জন্য নেতানেত্রীর মুখচ্ছবি। তোষামোদি করলেই যদি মিলে যায় কাংখিত পদটি। সেটা ব্যাংক, মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, দূতাবাস কিংবা রাষ্ট্রীয় কোন প্রতিষ্ঠানের কোন একটি। তা ভাঙ্গা গলায় কা কা আ আ করে যাওয়া তাদের অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাষায় তাদের বলা হয় ‘কাউয়া’।
ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনটি হলো মাত্র ৪ বা ৫ মাসের জন্য। সংবিধান অনুসারে ডিসেম্বর কিংবা জানুয়ারি মাসে সাধারন নির্বাচন হবে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হলে অনায়াসেই জিততেন সরকার দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ আরাফাত। যদিও ভোট পড়েছে ইতিহাসের সর্ব নিম্ন। ঢাকা-১৭ আসনে এমন অল্প ভোটে অতীতে কেউ এমপি হননি। মাত্র শতকরা ১১ ভাগ ভোট পড়েছে। বিজয়ী আরাফাত পেয়েছেন মাত্র ২৮ হাজার ভোট। বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে রুচির সংকটে থাকা হিরো আলম বেশি ভোট পেয়েছেন আরাফাতের চেয়ে। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আরাফাতের ভোটপ্রাপ্তির হার অসন্মানের। এখানতো লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেবার কথা। উদ্বেগের! বার্তাটিও সতর্ক হবার। ১০১ নম্বর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬২৬ জন। সেখানে ভোট পড়েছে মাত্র ৮৬টি। শতকরা হিসাবে ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এখানে আরাফাত পেয়েছেন ৪৯ ভোট। আর হিরো আলম পেয়েছে ২৮ ভোট। একই কলেজের ১০২ নম্বর কেন্দ্রে যেখানে ভোটার ৩ হাজার ৩৯৮ জন সেখানে ভোট পড়েছে ৭৬টি, শতকরা হিসাবে ২ দশমিক ২৪ শতাংশ। যার মধ্যে আরাফাত পেয়েছেন ৩৯ ভোট। আর হিরো আলম পেয়েছেন ৩২ ভোট। এই কলেজের ১০৩ নম্বর কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ৩১৭, ভোট পড়েছে ৮৬টি। এর মধ্যে আরাফাত পেয়েছেন ৪২ ভোট আর হিরো আলম পেয়েছে ২৪ ভোট। এছাড়া এই কলেজের ১০৪ নম্বর কেন্দ্রে মোট ভোটার ১ হাজার ৯৯৮ জন, ভোট দিয়েছেন মাত্র ১৯জন, শতকরা হিসাবে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। যা ১২৪টি কেন্দ্রের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই কেন্দ্রে আরাফাত পেয়েছেন ১২ ভোট। আর হিরো আলম পেয়েছেন ৪ ভোট। বিএনপি ও জামাত এই এই নির্বাচন বর্জন করেছে। আওয়ামী লীগ সর্মথকরা ভোট কেন্দ্রে গেলেই অনায়াসেই তার বিজয়। কিন্তু হিরো আলমকে নিয়ে কেন টেনশন ছিল সরকারি দলে? কেনইবা তার ওপর এমন বর্বরতম হামলা। স্বয়ং একজন প্রার্থীই নিরাপদ নয়. সেখানে ভোটার কেন যাবে কেন্দ্রে। এর একটি প্রধান কারন থাকতে পারে। তা হলো বিরোধী পক্ষকে আগাম বার্তা দেয়া। যারা স্বপ্ন দেখছেন আগামী সংসদ নির্বাচনের তাদের জন্য সংকেততো বটেই।

গণতন্ত্রের মানস কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বারবার সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। অথচ একটি দায়সাড়া নির্বাচনে একজন প্রার্থীর ওপর কেন এমন হামলা হলো। হয়তো বলবেন, পুলিশতো সাথে সাথে ব্যবস্থা নিয়েছে। জড়িতদের গ্রেফতার করেছে। আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বাস! ঘটনা ঘটার পর এ ধরনের কথা বাংলাদেশের মানুষ খায় না। বিএনপির শাসনামলে শেখ হাসিনার জনসভায় হামলার ঘটনায় ‘জজ মিয়া’ নাটকও বাংলাদেশের মানুষ নেয়নি। ধরেই নিলাম শেখ হাসিনা আন্তরিকভাবেই সবকিছু বলছেন। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে, দেশের এমন কিছু নেই যা প্রধানমন্ত্রীর নজরে অনুপস্থিত। তা’হলে কেন এমন ঘটনা ঘটছে? নিয়ন্ত্রন কি হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে? নাকি এক তরফা নির্বাচনের ফরমুলায় এগুচ্ছে বাংলাদেশ? যদি নিয়ন্ত্রন প্রধানমন্ত্রীর হাতে না থাকে তবে তা ভয়ংকর। ভয়ানক। পরিনতি হবে আরও দুর্বিসহ। দল ও প্রশাসনের ওপর যখন সরকার প্রধানের নিয়ন্ত্রন দুর্বল হতে থাকে তখন অনাকাংখিত  ঘটনার সমাবেশ ঘটে। ব্যাটগুলো পড়তে থাকে দ্রুত। চামচারা সরতে থাকে আচঁলের পাস থেকে। মুহুর্তের মধ্যে অনেক কিছু নাই হয়ে যায়। যেমনটি আমরা দেখেছি এরশাদের শাসনামলে ১৯৯০ সালের নভেম্বর/ডিসেম্বরে। ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া ৩ দিনের সংসদ বাতিল করে কিভাবে বঙ্গভবনে দৌড়ালেন তাতো নিজ চোখেই দেখেছি। হিরো আলম নির্বাচন দৌড়ের চেয়ে একধাপ এগিয়েই থাকলেন। তিনি  বৃহস্পতিবার ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আগামী কোন নির্বাচনে অংশ নেবেন না। এ কথাটি বলতে দ্বিধা নেই। ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনে আরাফাত,হিরো ও গনতন্ত্র কেউই জিততে পারেনি। জিতেছে অন্য কেউ।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হোসেন লিখেছেন,‘ ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে বলে নির্বাচন কমি শন দাবি করেছে। সেই সঙ্গে তারা ভোট গ্রহণের শেষ মুহূর্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলমের ওপর সন্ত্রাসী হামলাকে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস বলে অভিহিত করেছে।

প্রশ্ন হলো সেই অপপ্রয়াসটি কারা করল? নির্বাচনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে নিরাপত্তার দায়িত্বে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকেন, তাঁরাও তাদের ( কমিশনের) অধীন চলে যান। সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যে রূপ কর্মচারীর প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশন সেই রূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন।’ সে ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র কিংবা এর আশপাশে সংঘটিত অঘটনের দায়ও কমিশন এড়াতে পারে না।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। দেশের ভেতরে বিরোধী দল সমালোচনা করে বলেছে, যেই দল হিরো আলমকে সহ্য করতে পারে না, তারা কীভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে? জাতিসংঘ উদ্বেগ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ জানিয়েছে। ঢাকা ১২টি দেশের রাষ্ট্রদূতেরা যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
অন্যদিকে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি দেখেছেন ষড়যন্ত্র হিসেবে। হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হয়েছে। টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে। পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত বলে খবর বের হয়েছে। তাহলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ উপনির্বাচনকে কারা প্রশ্নবিদ্ধ করল, কারা ষড়যন্ত্র করল সেটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।’

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম