শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

সেই রাতের স্মৃতি মনে হলে আঁতকে ওঠেন মানুষ

ডেস্ক রিপোর্ট   |   মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর ২০২২   |   প্রিন্ট   |   ৩২৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সেই রাতের স্মৃতি মনে হলে আঁতকে ওঠেন মানুষ

১৫ নভেম্বর, ২০০৭। ১৫ বছর আগে আজকের এই দিনে সকাল থেকে উপকূলের দিকে এগোতে থাকে ঘূর্ণিঝড় সিডর। জারি করা হয় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। আতঙ্ক ছড়ায় উপকূলে। কেউ ছোটেন আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউ নিকটবর্তী পাকা বাড়িতে। সম্পদের মায়ায় অনেকে থেকে যান ভিটায়। সন্ধ্যার পর শুরু হয় তীব্র বাতাস; সঙ্গে জলোচ্ছ্বাস। রাত সাড়ে ৯টায় শুরু হয় মহাঝড় সিডরের তাণ্ডব। এ যেন মহাপ্রলয়। পটুয়াখালী, ভোলা, খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলের জেলাগুলোয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এ ঘূর্ণিঝড়। প্রাণ যায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। শত শত কোটি টাকার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাগর ফুলে ওঠে সেদিন যাদের ভাসিয়ে নিয়েছিল, তাদের অনেকের খোঁজ আজও মেলেনি।
সিডরের সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা মনে পড়লে আঁতকে ওঠেন উপকূলের লাখ লাখ বাসিন্দা। এখনও তাঁদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো হানা দেয় দুঃস্বপ্নের রাত। সিডরে কেবল বাগেরহাট জেলায় প্রাণ যায় ৯ শতাধিক মানুষের। ৬৩ হাজার ৬০০ বাড়িঘর ধ্বংস হয়। ১৭ হাজার ৪২৩টি গবাদি পশুর মারা যায়।
সবকিছু ছাপিয়ে সিডর রচনা করে এমন সব বিয়োগান্ত গল্প, যা শুনলে আজও মানুষের চোখ ভিজে ওঠে। সে সময় জীবিকার দায়ে চট্টগ্রামে থাকতেন শরণখোলার শফিকুল ইসলাম পঞ্চায়েত। বাড়িতে মা-বাবা, ছোট ভাই, দুই ভাগনি ও এক ভাগনের সঙ্গে রেখে যান সাড়ে চার বছরের ছেলেকেও। ঝড়ের পরদিন অনেক কষ্টে শরণখোলায় ফিরে দেখেন, পরিবারের সাতজনের মধ্যে শুধু ছোট ভাই সোহাগ বেঁচে আছে। বাকি ছয়জন নেই। নিজের শিশুসন্তানের মুখ আর কখনোই দেখতে পাননি তিনি।

মর্মান্তিক সেই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সোহাগ বলেন, ২০০৭ সালে তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তেন। সন্ধ্যার পর শুরু হয় তীব্র বাতাস। রাত ৯টার দিকে মানুষের চিৎকারে তাঁরা বাড়ি থেকে বের হন। প্রথমে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে ঘরের মধ্যে পানি উঠতে শুরু করলে আশ্রয়কেন্দ্রের উদ্দেশে বের হন। তিনি জানান, অন্ধকারে জোয়ারের পানি বাড়তে থাকে। পানির তোড়ে পরিবার থেকে দলছুট হয়ে পড়েন তিনি। স্রোত তাঁকে বড় একটি গাছে নিয়ে ফেলে। তিনি গাছটি ধরে বেঁচে যান। সকালে পরিবারের কাউকে আর পাননি। চার দিন পর মায়ের মরদেহ, ১০ দিন পর বাবার মরদেহ খুঁজে পান। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন সোহাগ।
শরণখোলার গাবতলা গ্রামের বাহাদুর খান জানান, সিডরে তাঁর বোন, চাচা ও চাচিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কয়েক দিন পর ধানক্ষেত থেকে তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধার করে দাফন করা হয়।

এখন স্বজনহারাদের দাবি, একটি টেকসই বেড়িবাঁধ। স্থানীয় সিদ্দিক ফকির বলেন, সিডরের পর থেকে তাঁদের দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ। এখনও দাবি পূরণ হয়নি।
সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে পটুয়াখালী অন্যতম। জেলার মির্জাগঞ্জে পায়রা নদীর তীরে রানীপুর গ্রামের রিজিয়া খাতুন স্বচক্ষে দেখেছেন সেদিনের ধ্বংসলীলা। বাতাসের সঙ্গে ছিল ১০ থেকে ১২ ফুট জলোচ্ছ্বাস। বৃদ্ধ রিজিয়া বলেন, ‘বইন্যা (জোয়ার) আরম্ভ হওনের পর পুতের বউডাসহ ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও সহায়-সম্বল হগোল ভাসাইয়্যা লইয়্যা গ্যাছে। মোরে ভাসাইয়্যা নিয়া গাছের মাথায় উঠায়। ওই গাছ ধইর‌্যাই সারারাত কাটাইছি।’
সেদিন পটুয়াখালীতে প্রাণ যায় ৪৬৬ জনের। আরও ২১১ জনের খোঁজ আজও মেলেনি। সরেজমিনে মির্জাগঞ্জ উপজেলার চরখালী, রানীপুর, মেন্দিয়াবাদ ও গোলাখালী এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মানুষের দুর্ভোগ এখনও কাটেনি। এখনও তাঁরা অসহায় দিন কাটাচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয় মির্জাগঞ্জে। সেখানে মারা যান ১১৬ জন। তাঁদের মধ্যে পায়রা নদীর তীরের চরখালী গ্রামে গণকবর দেওয়া হয় ১১০ জনকে। গণকবরটি সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। জমিদাতা ও চরখালী সমবায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা খান বলেন, গণকবরটি তাঁর বাড়ির পুকুর পাড়ে। এটি সুরক্ষার উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ফেরদৌস জানান, কবরটি সংরক্ষণে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এডিপির অর্থায়নে সংস্কার ও সীমানা প্রাচীর করা হবে।
পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে সিডরে প্রাণ যায় কঁচা-বলেশ্বর নদের তীরবর্তী গ্রামগুলোর ৭২ বাসিন্দার। নদীর বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে পড়লে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। নদীর ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখনও অরক্ষিত।
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন পটুয়াখালী, বাগেরহাট, শরণখোলা ও ইন্দুরকানী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি]

Facebook Comments Box

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম