ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৭৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
দীর্ঘ কয়েক দশকের সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সিশেলস। দেশটির প্রত্যন্ত আলদাব্রা অ্যাটোলে বিরল প্রজাতির আলদাব্রা জায়ান্ট টরটয়েজের সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পূর্ণবয়স্ক ও প্রায় পূর্ণবয়স্ক কচ্ছপের সংখ্যা আনুমানিক ১ লাখ ৮৩ হাজার বলে উঠে এসেছে। বন্য পরিবেশে অবাধে বিচরণকারী বিশালাকার কচ্ছপের এটিই বিশ্বের বৃহত্তম পরিচিত জনসংখ্যা।
দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষকদের মতে, একসময় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা এই প্রজাতির পুনরুদ্ধার বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
পাঁচ বছরের জরিপে উঠে এসেছে নতুন চিত্র
সিশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশন (এসআইএফ) ও যুক্তরাজ্যের এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে জরিপটি পরিচালিত হয়। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সংগৃহীত কচ্ছপ গণনার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই হিসাব নির্ধারণ করেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে প্রকাশিত বহুল উদ্ধৃত তথ্যে আলদাব্রা অ্যাটোলে কচ্ছপের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় পরও এই প্রজাতির জনসংখ্যা শুধু টিকে নেই, বরং বড় আকারের একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে স্থিতিশীল রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন’-এ প্রকাশিত গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, পাঁচ বছরের পর্যবেক্ষণকালে কচ্ছপের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। পৃথিবীতে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশালাকার স্থলকচ্ছপের বিচরণ রয়েছে এমন দুটি উল্লেখযোগ্য স্থানের একটি আলদাব্রা অ্যাটোল; অন্যটি প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ।
সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় ফিরেছে কচ্ছপের বিশাল জনগোষ্ঠী
সিশেলস আইল্যান্ডস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. ফ্রাউকে ফ্লেশার-ডগলি বলেন, অ্যাটোলে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি বিশালাকার কচ্ছপ স্বাধীনভাবে বিচরণ করছে। তাঁর মতে, পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার যে অসাধারণ সাফল্য এনে দিতে পারে, এই পরিসংখ্যান তার প্রমাণ।
তিনি বলেন, এটি সিশেলস, সমগ্র বিশ্ব এবং আলদাব্রাকে রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করা সবার জন্য আনন্দের সংবাদ।
তবে এই সাফল্যের পেছনের ইতিহাস ছিল উদ্বেগজনক। উনবিংশ শতাব্দীতে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত শিকার ও শোষণের কারণে আলদাব্রা জায়ান্ট টরটয়েজের সংখ্যা এক হাজারেরও নিচে নেমে গিয়েছিল।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮১ সালে আলদাব্রাকে কঠোর সংরক্ষিত অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরের বছর, ১৯৮২ সালে, ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি দেয়। গবেষকদের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাফল্যের উদাহরণ এটি।
ঘন উদ্ভিদের কারণে কচ্ছপ গণনায় ছিল চ্যালেঞ্জ
গবেষণার সহলেখক ড. ন্যান্সি বানবুরি জানান, দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চললেও অ্যাটোলের ঘন উদ্ভিদের কারণে কচ্ছপের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন ছিল।
তিনি বলেন, গবেষকেরা সরাসরি দেখতে পাওয়া কচ্ছপের পাশাপাশি ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে থাকা প্রাণীর সংখ্যাও বৈজ্ঞানিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে হিসাব করেছেন। এর ফলে এই প্রজাতির জনসংখ্যা সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের আশা, এই হিসাব ভবিষ্যতে কচ্ছপের সংখ্যা পর্যবেক্ষণ এবং সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বহিরাগত প্রাণীর হুমকি
কচ্ছপের সংখ্যা বেড়ে গেলেও সংরক্ষণ কার্যক্রমে শিথিল হওয়ার সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আলদাব্রায় দীর্ঘস্থায়ী ও ঘন ঘন খরা দেখা দিতে পারে। এতে কচ্ছপের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার ও ছায়ার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বীপের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বুনো বিড়াল ও কালো ইঁদুরের মতো বহিরাগত প্রাণীও কচ্ছপের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এসব প্রাণী কচ্ছপের ডিম ও সদ্য ফোটা ছানা শিকার করে।
গবেষকদের মতে, ক্ষতিকর বহিরাগত প্রাণীগুলো নির্মূল করা সম্ভব হলে কচ্ছপের প্রজননের ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা দূর হতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় প্রজাতিটিকে আরও সহনশীল করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
এক্সটার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্নওয়াল ক্যাম্পাসের পোস্টডক্টরাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ড. ডেভ হাডসন বলেন, এই গবেষণার ফলাফল পরিবেশকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রতিফলন এবং কচ্ছপগুলোর জন্য বড় সুসংবাদ। তবে এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি সংরক্ষণের দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও বহিরাগত প্রজাতির ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় গবেষণার তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপকদের আগাম পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান