ডেস্ক রিপোর্ট | মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২২০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
নেপালে ভয়াবহ বন্যার পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ টানেলে শত শত শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে পাহাড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে টানেলের দিকে যাওয়ার পথ তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভেতরে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বাতাস পাম্প করছেন উদ্ধারকারীরা।
বিবিসি নেপালির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ৯০০ জনের বেশি কর্মী গত বুধবারের পর থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। তবে টানেলের ভেতরে ঠিক কতজন আটকা পড়েছেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজরাম বসনেত জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাসুওয়াগাধি, লাংটাং, চিলিমে, আপার ত্রিশুলি ৩এ ও আপার ত্রিশুলি ৩বি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলেছে।
ত্রিশুলি ৩এ প্রকল্প এলাকায় পাহাড়ের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে টানেলের দিকে যাওয়ার পথ তৈরির চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে ভেতরে বাতাস পাঠানো হচ্ছে। উদ্ধারকারীদের আশঙ্কা, জীবিত শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।
‘শুধু চাই, স্বামী জীবিত ফিরে আসুক’
নিখোঁজ প্রকৌশলী অরুস ভান্ডারির স্ত্রী অনুশিলা ভান্ডারি স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। ৩৩ বছর বয়সী অরুস বন্যার সময় প্রকল্প এলাকায় কর্মরত ছিলেন।
নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তাঁদের অনেকেই দ্রুত উদ্ধার অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। একজন স্বজন জীবন খড়কা বলেন, সময় যত যাচ্ছে, তাঁদের আশা ততই কমে যাচ্ছে। তাঁদের কাছে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।
তবে টানেলের ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকায় এখনও আশাবাদী কিছু পরিবার। নিখোঁজ এক শ্রমিকের স্ত্রী সিতা পাণ্ডে বলেন, তাঁর এখনও ৫০ শতাংশ আশা রয়েছে যে তাঁর স্বামী বেঁচে আছেন।
মৃত ৯৫৫, নিখোঁজ প্রায় ৪ হাজার
এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে ৯৩৯ এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিখোঁজের সংখ্যা সংশোধন করে ৩ হাজার ৯২৫ জন জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে ১১ হাজার ৩৭৯ জনকে। উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
নেপালি ও চীনা সামরিক সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে। ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরাও অভিযানে সহায়তা করছেন।
‘টানেলের চিহ্নই হারিয়ে গেছে’
অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী আর্নল্ড ডিক্স দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধান অভিযানে সহায়তা করছেন। তাঁর মতে, বন্যার ভয়াবহতায় টানেলগুলোর চিহ্ন পর্যন্ত হারিয়ে গেছে। ফলে কোথায় কীভাবে পৌঁছানো যাবে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাট ওয়ান’ অনুষ্ঠানে ডিক্স বলেন, পুরো এলাকাটি এখন অনেকটা চাঁদের পৃষ্ঠের মতো হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা গেলে সেখানে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
তাঁর ধারণা, ভূগর্ভে আটকা পড়া শ্রমিকদের বেঁচে থাকার কিছুটা সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ওপরের প্রবল বন্যার সরাসরি ধাক্কা থেকে টানেলের ভেতরের পরিবেশ তাঁদের সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে।
চিতওয়ানে ভেসে আসছে মরদেহ
বন্যার মূল আঘাতের স্থান থেকে ভাটির দিকে অবস্থিত চিতওয়ান জেলায়ও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের নদীপথে ভেসে আসা প্রায় ৩০০ মরদেহ সেখানে তীরে জমা হয়েছে।
শনাক্ত করা যায়নি এমন মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন। পর্যাপ্ত ফ্রিজার না থাকায় কিছু মরদেহ অস্থায়ীভাবে দাফন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তিব্বতে সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজ ৫৪৬ জন। বন্যা নিয়ে ভুল তথ্য বা গুজব ছড়ানোর অভিযোগে অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে নেপাল ও চীন কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: বিবিসি বাংলা