শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ভয়াবহ হড়পা বান-ভূমিধসে নেপাল-তিব্বতে ৩৯০ ছাড়াল মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০

ডেস্ক রিপোর্ট   |   বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ভয়াবহ হড়পা বান-ভূমিধসে নেপাল-তিব্বতে ৩৯০ ছাড়াল মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ৩৯০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি। আকস্মিক বন্যায় নদীর পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে এসে শহর, জনপদ ও উপত্যকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) কাদামাটির মধ্যে নেমে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চালান কর্মীরা। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আর প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিনজন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দুর্যোগের একদিন পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তিব্বতের ভূমিধসকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। এ সময় তিনি জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

নিখোঁজের তালিকায় শত শত বিদেশি

নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিখোঁজ ৯১০ জনের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিক ও পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন।

নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ১০০ জন চীনা নাগরিকও রয়েছেন।

অন্যদিকে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ

ধ্বংসস্তূপ ও সড়ক-সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে সরকারি ও বেসরকারি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে।

হেলিকপ্টারে করে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় খাবার, ওষুধ ও জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, আহতদের অনেকের পাঁজর ভেঙেছে এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত রয়েছে।

নেপালের পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হাজারো সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, ভারত সরবরাহ করা তাঁবু, খাবার ও ওষুধ হেলিকপ্টারে করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। অভিযানে পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য যুক্ত হয়েছেন।

ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু

বুধবারের ভিডিও ফুটেজে দ্রুতগতির পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে গিরং সীমান্তবর্তী এলাকায় বহু মানুষ ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। সংবাদ সংস্থাগুলো ফুটেজটি যাচাই করেছে।

নেপালের দিকে নদীর নিম্নপ্রবাহে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে ধসে পড়া বাড়ি, পানিতে ডুবে থাকা গাড়ি এবং প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি ধাতব সেতু দেখা গেছে।

নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার স্থানে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি ক্রমেই বাড়ছে। যেকোনো সময় হ্রদটি ভেঙে পড়লে নতুন করে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

রাসুওয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকি বলেন, ‘যেদিকেই তাকাই, ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।’

কীভাবে শুরু হলো বিপর্যয়?

প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, শুরুতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে যে কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি প্রকৃতপক্ষে হিমবাহের পাথর ও বরফ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি। এর পরপরই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে আসে।

প্ল্যানেট ল্যাবসের প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষসহ প্রবল স্রোত তৈরি হয়। ঘটনাস্থলটি নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।

দুর্যোগকবলিত উপত্যকাগুলোতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন ঘন কাদায় ঢেকে গেছে।

তীর্থযাত্রী-পর্যটকরাও বিপাকে

দুর্যোগের সময় তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর হ্রদে তীর্থযাত্রায় থাকা মানুষজনও বিপদের মধ্যে পড়েছেন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে উচ্চভূমির এসব স্থান অত্যন্ত পবিত্র।

এলাকাটি তিব্বতের লাসা থেকে কাঠমান্ডু যাতায়াতকারী পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছেও জনপ্রিয়।

এদিকে বন্যার পানি গান্ডাক নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভারতের নেপাল সীমান্তবর্তী বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড রাজ্য থেকেও হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটের বিদুরের পরিস্থিতি দেখতে সড়কপথে রওনা হয়েছেন বলে তার কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে।

নেপালের পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়

ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় একজন পরামর্শককে নেপালে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তরের প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে জাতিসংঘের বৈশ্বিক জরুরি তহবিল (সিইআরএফ) থেকে ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি ত্রাণ ও সহায়তাকর্মী পাঠানোর কথা জানিয়েছেন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই বন্যাকে ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও দুর্গম এলাকার অবকাঠামো ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন।

জলবায়ু ঝুঁকির সতর্কবার্তা

এই ভয়াবহ দুর্যোগ নেপালের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টিও সামনে এনেছে বলে মনে করেন জলবায়ু ও জননীতি বিশেষজ্ঞ সুনীল আচার্য।

তার মতে, এটি কেবল একটি অনির্দেশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারিতে বসবাসের বাস্তবতাও এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে।

সুনীল আচার্য বলেন, এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে নেপালের একার পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।

সূত্র: আল জাজিরা, এপি নিউজ

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম