নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। হাতির বিলুপ্তি রোধ, আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর এ দিনটি পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য—‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি।’
বাংলাদেশে হাতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, বন দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও হাতির চলাচলের করিডর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে বন্যহাতি। এতে বাড়ছে ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি, একই সঙ্গে তীব্র হচ্ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত।
চুনতি বনে বসতি, সংকটে হাতির আবাসস্থল
কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার আবদুর রহমান একসময় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা চালাতেন। ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে বছরে তিন-চারবার জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে যেত। ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে দুই বছর আগে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামের চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েন তিনি। এখন বননির্ভর কাজ করেই ছয় সদস্যের পরিবারের জীবিকা চলছে।
একইভাবে বাঁশখালীর পশ্চিম বড়ঘোনার মনসুর আলমসহ অনেক পরিবার চুনতি সংরক্ষিত বনে বসতি গড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু পূর্ব জঙ্গল চাম্বল অংশেই ৭০ থেকে ৮০টি পরিবারের বসতি রয়েছে। পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর অংশেও বনভূমিতে বসতি গড়ে উঠেছে।
বনভূমিতে বসতি ও চাষাবাদের কারণে হাতির খাদ্যযোগ্য গাছপালা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বন্ধ হচ্ছে হাতির চলাচলের ঐতিহ্যবাহী পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডর’। ফলে খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতির পাল।
স্থানীয় হাবিবুল্লাহ বলেন, কয়েক বছর আগেও এলাকায় হাতির আতঙ্ক ছিল না। এখন প্রায়ই হাতি লোকালয়ে এসে ফসল নষ্ট করছে। গত সপ্তাহেও রাতে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত ধ্বংস করেছে।
স্থানীয় ফজল কাদের বলেন, হাতি লোকালয়ে এলে শিস দিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়। এরপর আগুন জ্বালিয়ে হাতির পালকে বনের দিকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, সংরক্ষিত বন ও লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। বনভূমিতে বসতি স্থাপনের কারণে হাতি-মানুষের সংঘাতের ঝুঁকি বেড়েছে। হাতির আবাসস্থল রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরির কাজ চলছে।
বেলার চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়কারী মনিরা পারভিন বলেন, কয়েক বছর ধরে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব বাড়ছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীনদের পুনর্বাসনের ফলে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ—সব পক্ষই ক্ষতির মুখে পড়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ বলেন, হাতির আবাসস্থল বনাঞ্চল। বনের পরিবেশ ভালো না থাকলে খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে চলে আসবে। হাতি রক্ষায় নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত পানি ও খাবার নিশ্চিত করা জরুরি।
এক দশকে চুনতিতে ১৪ হাতির মৃত্যু
প্রায় ১৯ হাজার একর আয়তনের চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বড় একটি অংশ বাঁশখালী উপজেলায়। উপজেলার পূর্ব পাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতি চলাচলের করিডর।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে ১০২টি হাতি মারা গেছে। এর মধ্যে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশেই মারা গেছে ১৪টি।
বাংলাদেশে এশীয় হাতি ‘মহাবিপন্ন’ প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত। ১৯৮৬ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) হাতিকে লাল তালিকাভুক্ত করে।
দেশে হাতির সংখ্যা কত?
দেশে হাতির সংখ্যা, বিচরণক্ষেত্র ও চলাচলের পথ জানতে এ পর্যন্ত ১৯৮০, ২০০০ ও ২০১৬ সালে তিনটি সরকারি জরিপ হয়েছে।
১৯৮০ সালের জরিপে দেশে হাতির সংখ্যা ছিল ৩৮০টি। ২০০০ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৩৯টিতে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের জরিপে দেশে ২৬৮টি হাতির সন্ধান পাওয়া যায়।
বন অধিদপ্তর ও আইইউসিএনের মতে, হাতি-মানুষের সংঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হাতির ঐতিহ্যবাহী চলাচলের পথ বা এলিফ্যান্ট করিডর ধ্বংস হওয়া। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পাহাড় কেটে বসতি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে এসব করিডর দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
গারো পাহাড়ে হাতি বাড়লেও ঝুঁকি কমেনি
শেরপুরের গারো পাহাড়ে অবশ্য হাতির সংখ্যা বাড়ছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন বছরে সেখানে অন্তত ৫৫টি হাতির শাবক জন্মেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগে এই এলাকায় ১০০ থেকে ১২০টি হাতির বিচরণ থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ড্রোন ক্যামেরায় বনের ভেতর ৩৪টি হাতির একটি পাল দেখা গেছে। ওই পালে ৮ থেকে ১০টি শাবক ছিল বলে বন বিভাগ জানিয়েছে।
তবে বন উজাড়, বালু-পাথর উত্তোলন, বন দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাতির খাবারের সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে হাতি প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে। এতে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে। বালিজুরি রেঞ্জের প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির উপযোগী খাদ্যসমৃদ্ধ বাগান তৈরির কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতি রক্ষায় শুধু লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ঠেকানো যথেষ্ট নয়। তাদের নিরাপদ আবাসস্থল, চলাচলের করিডর, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে হাতি-মানুষের সংঘাত আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে পুরো পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।