ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ হারানোর পর এবার আদালতের বাধার মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চাভিলাষী ‘মেগা তোরণ’ নির্মাণ প্রকল্প। ওয়াশিংটনে ২৫০ ফুট উঁচু বিশাল এই তোরণ নির্মাণে ১৫ দিনের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন মার্কিন জেলা আদালতের বিচারক তানিয়া চুটকান। ফলে আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে প্রকল্পের সব ধরনের নির্মাণকাজ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জনশুনানি ও নাগরিকদের তীব্র আপত্তির পর প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন (এনসিপিসি)। তবে অনুমোদনের মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই আদালত নির্মাণকাজে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, পরবর্তী ১৫ দিন প্রস্তাবিত নির্মাণস্থল ও এর আশপাশে কোনো ধরনের নির্মাণ-সম্পর্কিত কার্যক্রম চালানো যাবে না। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি ও ভয়াবহ যানজটের ঝুঁকির কথাও আদেশে উল্লেখ করেছেন বিচারক।
বৃহস্পতিবার রাতে ভার্চুয়াল বৈঠকে ৮-৪ ভোটে তোরণ নির্মাণের অনুমোদন দেয় এনসিপিসি। এর আগে জনশুনানিতে ১২০ জনের বেশি নাগরিক প্রকল্পটির বিরোধিতা করেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছিলেন সাবেক সেনাসদস্য।
তবে আগামী জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগেই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে ট্রাম্পের সমর্থক ও মনোনীত সদস্যদের নিয়ে গঠিত কমিশন দ্রুত অনুমোদন দেয়। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম তোরণ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার মতো এই স্থাপনার নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সমাধিক্ষেত্রের সৌন্দর্য নষ্টের শঙ্কা
প্রকল্পটির বিরুদ্ধে যুদ্ধাহত সাবেক সেনাসদস্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণবাদীরা মামলা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তোরণটির বিশাল আকৃতি ও অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর দৃশ্যপট নষ্ট করবে।
বিশেষ করে লিঙ্কন মেমোরিয়াল, আর্লিংটন হাউস ও রবার্ট ই লি মেমোরিয়ালের মধ্যবর্তী দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আর্লিংটন জাতীয় সমাধিক্ষেত্রের গম্ভীর পরিবেশও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
বিরোধীদের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অথচ ‘কমেমোরেটিভ ওয়ার্কস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, ওয়াশিংটনে নতুন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
বৃহস্পতিবার নির্মাণস্থলের আশপাশে বিক্ষোভ করেন প্রকল্পবিরোধীরা। এতে অংশ নিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডন বায়ার বলেন, একজন ব্যক্তির অহংবোধ থেকে তৈরি এই বিশাল স্থাপনা সেখানে শায়িত প্রতিটি বীর সেনাসদস্যের প্রতি চরম অবমাননা।
তোরণ নিয়ে ট্রাম্পের ‘আমার জন্য’ মন্তব্য
গত অক্টোবরে ওভাল অফিসে তোরণের বিভিন্ন আকারের মডেল প্রদর্শন করেন ট্রাম্প। এ সময় এক সাংবাদিক তোরণটি কার উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে জানতে চাইলে নিজের দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জন্য।’
পরে অবশ্য ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী, আমেরিকানদের চেতনা, সামরিক শক্তি ও সক্ষমতার স্মারক হিসেবে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি তিনি আরও দাবি করেন, পটোম্যাক নদীর কাছে ব্যস্ত ট্রাফিক সার্কেলে নির্মিতব্য তোরণটি পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি ড্রোন ও গোলাবারুদ সংরক্ষণের সামরিক কমপ্লেক্স হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। তবে এনসিপিসির কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত নথিতে সামরিক স্থাপনার কোনো উল্লেখ ছিল না।
৪২টি ঐতিহাসিক স্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা
দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করতে দিনে দুটি ১০ ঘণ্টার শিফটে ২৪ ঘণ্টা কাজের পরিকল্পনা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বৃহস্পতিবার আদালতে ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস (এনপিএস) স্বীকার করে, তাদের নিয়োগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের আগেই নির্মাণস্থলের চারপাশে চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু করেছিল। আদালতে তারা জানিয়েছে, আপাতত এ ধরনের কাজ আর করা হবে না।
মামলার প্রধান বাদী মাইকেল লেমন অভিযোগ করেন, পুরো পর্যালোচনা প্রক্রিয়াটি তাড়াহুড়ো করে পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এতে কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর পাশাপাশি আর্লিংটনের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নও উপেক্ষা করা হয়েছে।
গত আগস্টে প্রকাশিত ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের এক পর্যালোচনায় বলা হয়, প্রস্তাবিত তোরণটি প্রায় ৪২টি ঐতিহাসিক স্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেট্রি ও লিঙ্কন মেমোরিয়ালসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
এ ছাড়া ক্যাপিটল হিল, জর্জটাউন ওয়াটারফ্রন্ট ও পেন্টাগন থেকেও তোরণটি দেখা যাবে। এতে ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে বলে পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঐতিহাসিক সংরক্ষণ আইনের ১০৬ ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক সংরক্ষণ গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ও সমঝোতা প্রয়োজন। কিন্তু গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন কোনো চুক্তি ছাড়াই পরামর্শ প্রক্রিয়া শেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোয়।
এনসিপিসির চূড়ান্ত অনুমোদনের মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই স্বরাষ্ট্র বিভাগ প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে আদালতের ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় আপাতত থেমে গেছে নির্মাণের তোড়জোড়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয় এবং এর পরপরই আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সূত্র: সিএনএন