শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

এনআইডি সংশোধনে ইসির বড় অগ্রগতি, নিষ্পত্তি ৬৪ লাখের বেশি আবেদন

ডেস্ক রিপোর্ট   |   শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

এনআইডি সংশোধনে ইসির বড় অগ্রগতি, নিষ্পত্তি ৬৪ লাখের বেশি আবেদন

জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনে বড় অগ্রগতি অর্জন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এখন পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি করেছে সংস্থাটি। তবে এখনো অপেক্ষমাণ রয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ১০টি আবেদন। বিভিন্ন কারণে বাতিল করা হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন।

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে। বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির পরও নতুন আবেদন, অযৌক্তিক সংশোধনের দাবি ও জালিয়াতি প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যক্রম জোরদার করেছে কমিশন।

আবেদন নিষ্পত্তিতে সময়সীমা নির্ধারণ, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে কার্যক্রমে গতি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাসে জমা পড়ছে ৮০-৯০ হাজার আবেদন

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সাল পর্যন্ত জমা পড়া এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আবেদনগুলোর নিষ্পত্তিও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে প্রতি মাসে গড়ে ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ায় কিছু আবেদন অপেক্ষমাণ থাকছে।

এর বাইরে রয়েছে সংশোধনের অযোগ্য আবেদন এবং একই বিষয়ে একাধিক ক্যাটাগরিতে পুনরায় আবেদন করার প্রবণতা। এসব কারণে আবেদন নিষ্পত্তির কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে অপেক্ষমাণ প্রায় ৭০ হাজার আবেদন

ইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৬৮ হাজার ২৬৯টি আবেদন। ২০২৫ সালের একই ক্যাটাগরিতে অপেক্ষমাণ রয়েছে আরও ৯৮৩টি আবেদন। সব মিলিয়ে এ ক্যাটাগরিতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আবেদনের সংখ্যা ৬৯ হাজার ২৫২টি।

অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ঢাকা অঞ্চলে ১০ হাজার ৬১৫টি, ফরিদপুরে ৫ হাজার ১৪০টি, খুলনায় ৫ হাজার ৮৭১টি, ময়মনসিংহে ৮ হাজার ৩৩২টি এবং রংপুরে ৪ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অপেক্ষমাণ রয়েছে।

এ ছাড়া সিলেটে ৬ হাজার ৪৬৯টি, রাজশাহীতে ৬ হাজার ৮৭৫টি, বরিশালে ৪ হাজার ২২৬টি, চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৬৮৮টি এবং কুমিল্লায় ১০ হাজার ৫৫৯টি আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এসব অঞ্চলে দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন।

আবেদন নিষ্পত্তিতে সময়সীমা, কমছে প্রশাসনিক জটিলতা

এনআইডি সংশোধন কার্যক্রমে গতি আনতে আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে ইসি। পাশাপাশি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আবেদন নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকেরা নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্ভুলভাবে কাজ করাই প্রধান লক্ষ্য। ভোটার নিবন্ধনের সময় এমনভাবে তথ্য যাচাই করতে হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন না পড়ে।

তিনি বলেন, অতীতে অযৌক্তিক আবেদন সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। বর্তমানে যুক্তিসংগত নয়—এমন আবেদন বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতিটি আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত বছর বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

আখতার আহমেদ আরও বলেন, সংশোধনের জন্য জমা পড়া কিছু আবেদনের ক্ষেত্রে বাস্তবে আর সংশোধনের প্রয়োজন নেই। আবার বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের কিছু আবেদনে স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেওয়া তথ্যের অসংগতিও পাওয়া যায়। যাচাই-বাছাই করে এসব আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

জন্মতারিখ সংশোধনে বাড়ছে নজরদারি

এনআইডিতে জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে অনলাইনে যাচাইযোগ্য শিক্ষাসনদকে গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি জোরদার করেছে নির্বাচন কমিশন।

সম্প্রতি এ বিষয়ে সব আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছে ইসি। গত ১৩ আগস্ট জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, অনলাইনে যাচাইযোগ্য জেএসসি, মাধ্যমিক বা সমমানের শিক্ষাসনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের আবেদন ‘ক’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা নিষ্পত্তি করতে পারবেন। তবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি দৈবচয়নের ভিত্তিতে প্রতি মাসে প্রত্যেক নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তার অন্তত তিনটি আবেদন যাচাই করে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

গত ১৩ থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদন ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসের প্রতিবেদন পরের মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে জন্মতারিখ সংশোধনের সিদ্ধান্তের যথার্থতা ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায় কমিশন।

অযোগ্য আবেদন বাতিল, বয়সের অসংগতিতে কঠোর যাচাই

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অপেক্ষমাণ ও বাতিল হওয়া আবেদনের একটি অংশ সংশোধনের অযোগ্য। বয়স সংশোধনের ক্ষেত্রে কখনো দেখা যায়, বাবা ও সন্তানের বয়সের ব্যবধান মাত্র ১০ বছর। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনের পর দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভোটার হওয়ার সময় বয়স ১৮ বছরের কম ছিল। এ ধরনের অসংগতি থাকলে আবেদন বাতিল করা হয়।

তিনি আরও বলেন, কোনো আবেদন একটি ক্যাটাগরিতে বাতিল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অন্য ক্যাটাগরিতে আবার আবেদন করেন। এতে একই ধরনের আবেদনের পুনরাবৃত্তি ঘটে এবং অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা বেশি বলে মনে হতে পারে।

অপেক্ষমাণ আবেদন নিষ্পত্তিতে নিয়মিত বৈঠক করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিঠি পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সেবার মানসিকতা, দায়িত্ববোধ ও নিয়মিত তদারকি কার্যক্রমের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে।

জালিয়াতি রোধে কঠোর অবস্থান, আসছে প্রযুক্তিগত উদ্যোগ

এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হচ্ছে। কমিশনের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ।

তিনি বলেন, জালিয়াতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। তবে শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, জালিয়াতির ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে।

ইসি সচিবের আশা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা গেলে এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতির ঘটনা আরও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এদিকে, প্রতারক চক্রের প্রলোভনে পা না দিতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করছে এনআইডি বিভাগ। এ বিষয়ে হেল্পডেস্ক থেকেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম।

নির্ভুল নিবন্ধনই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান

প্রতি মাসে ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার নতুন আবেদন জমা পড়ার বাস্তবতায় শুধু নিষ্পত্তির গতি বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, নিবন্ধনের সময় তথ্য যাচাই জোরদার, আবেদনকারীদের সঠিক তথ্য দেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশোধনের প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

৬৪ লাখের বেশি আবেদন নিষ্পত্তির পর এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—অবশিষ্ট আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়োজন কমিয়ে নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম