ডেস্ক রিপোর্ট | রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধ আর শুধু নিজ ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের মরুভূমিতেও রাশিয়ার মিত্রদের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে কিয়েভ। উত্তর মালির উত্তপ্ত ও ধুলোময় পরিবেশে স্থানীয় বিদ্রোহীদের ড্রোন পরিচালনা ও যুদ্ধকৌশল শেখাচ্ছেন ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালিতে প্রায় ১৫ জন ইউক্রেনীয় সামরিক বিশেষজ্ঞ অবস্থান করছেন। তাঁরা মূলত উত্তরাঞ্চলের তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের নিয়ে গঠিত আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্টকে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, এসব বিশেষজ্ঞ সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন না।
মালিতে অবস্থানরত এক ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটর সিএনএনকে জানান, বিদ্রোহীরা মাঠে থেকে ড্রোন পরিচালনা করেন। তিনি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ড্রোনের সংকেত গ্রহণ করেন এবং বেতারে তাঁদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। অভিযান শেষে পুরো কার্যক্রম পর্যালোচনাও করেন তাঁরা।
মালি ছাড়াও সুদানে ইউক্রেনের কয়েকজন সামরিক বিশেষজ্ঞ অবস্থান করছেন বলে দেশটির প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে। চাদ, নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর সেনারাও আগে মালিতে গিয়ে ইউক্রেনীয়দের কাছ থেকে ড্রোন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
আফ্রিকায় রাশিয়ার প্রভাব বাড়ছে
সাহেল অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার প্রভাব দ্রুত বেড়েছে। ফরাসি ও অন্যান্য পশ্চিমা বাহিনী সরে যাওয়ার পর নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে আফ্রিকার এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে মস্কো।
এর বিনিময়ে স্থানীয় সরকারগুলোর কাছ থেকে অর্থ ও খনিজ সম্পদে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে রাশিয়া। প্রথমদিকে এসব কার্যক্রমে ওয়াগনার গোষ্ঠীকে ব্যবহার করেছিল মস্কো।
২০২৩ সালে ওয়াগনার প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের মৃত্যুর পর গোষ্ঠীটির অবশিষ্ট অংশকে রুশ সামরিক কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করে ‘আফ্রিকা কোর’ গঠন করা হয়। বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে মস্কোর মিত্র সরকারগুলোকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে এই বাহিনী।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আফ্রিকায় কিয়েভের তৎপরতার অন্যতম লক্ষ্য রাশিয়ার ওপর চাপ তৈরি করা এবং দেশটিকে ‘নির্ভরযোগ্য মিত্র’ হিসেবে উপস্থাপনের ধারণাকে দুর্বল করা।
মরুভূমিতে বদলাতে হচ্ছে যুদ্ধকৌশল
মালির যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেনীয়দের জন্যও একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের তুলনায় মালির সামরিক পরিবেশ অনেক বেশি প্রতিকূল ও বিচিত্র।
এক ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটরের ভাষ্য, প্রচণ্ড গরম, ধুলা ও বালুর কারণে ব্যাটারি, যন্ত্রপাতি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে মরুভূমিতে ড্রোন পরিচালনার কৌশলও বদলাতে হয়।
ইউক্রেনে যেখানে ব্যাপক হামলা ও অবিরাম চাপের মধ্যে যুদ্ধ চলে, মালিতে সেখানে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট ছোট দল, অতর্কিত হামলা, পথ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির জ্ঞানের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
অর্থাৎ, ইউক্রেনীয়রা স্থানীয় যোদ্ধাদের ড্রোন ও যুদ্ধকৌশল শেখাচ্ছেন, আর স্থানীয় যোদ্ধাদের কাছ থেকে কঠিন মরুভূমি পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল শিখছেন ইউক্রেনীয়রা।
কিদাল দখলেও ইউক্রেনীয় সহায়তার দাবি
২০২৪ সাল থেকেই তুয়ারেগ বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইউক্রেনের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। ওই বছরের জুলাইয়ে আলজেরিয়া সীমান্তের কাছে তিঞ্জাওয়াতেন এলাকায় বিদ্রোহীদের হামলায় ওয়াগনার যোদ্ধা ও মালির কয়েকজন সেনা নিহত হন।
সে সময় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের মুখপাত্র আন্দ্রি ইউসভ বিদ্রোহীদের ‘প্রয়োজনীয় তথ্য’ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
চলতি বছরের শুরুতে কিদাল শহর দখলেও ইউক্রেনীয়রা বিদ্রোহীদের সহায়তা করেছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছেন মালিতে থাকা এক ড্রোন অপারেটর।
তাঁর দাবি, তুয়ারেগ বিদ্রোহী ও আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোদ্ধাদের যৌথ হামলার মুখে রুশ সেনারা সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ওই ঘটনায় ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ভাড়াটে প্রশিক্ষকদের ভূমিকার অভিযোগ করেছে। কিয়েভ অবশ্য এর আগে বিদ্রোহীদের সঙ্গে বড় ধরনের সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
লিবিয়াতেও ইউক্রেনের ড্রোন তৎপরতা
আফ্রিকায় ইউক্রেনের সামরিক তৎপরতা শুধু মালিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম লিবিয়াতেও ইউক্রেনীয় নৌ-ড্রোন অপারেটররা অবস্থান করছেন।
লিবিয়ায় থাকা এক ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা জানান, মিসরাতা আন্তর্জাতিক সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত তথাকথিত ‘ছায়া বহর’-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাহিনীকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের একটি বিস্ফোরকবাহী নৌ-ড্রোন গ্রিসের পশ্চিমাঞ্চলের লেফকাদা দ্বীপের কাছে ভেসে উঠলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এ ঘটনায় গ্রিস ইউক্রেনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। পরে কিয়েভ দুঃখ প্রকাশ করে এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে হামলার প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে এর জন্য দায়ী করে।
ইউক্রেনের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান কিরিলো বুদানভ ২০২৩ সালে বলেছিলেন, পূর্ণ বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের যেকোনো জায়গায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে চাপ অব্যাহত রাখাই ইউক্রেনের লক্ষ্য।
আফ্রিকার মরুভূমিতে সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় তৎপরতা সেই কৌশলেরই নতুন বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: সিএনএন