শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

বাংলা সিনেমায় নারীপ্রধান চরিত্রের সেকাল আর একাল

বিনোদন ডেস্ক   |   রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

বাংলা সিনেমায় নারীপ্রধান চরিত্রের সেকাল আর একাল

দীর্ঘদিন ধরে এই উপমহাদেশে একটি প্রচলিত ধারণা ছিল– নারীকেন্দ্রিক সিনেমা দর্শক টানে না, বক্স অফিসে সাফল্য পায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে অসংখ্য চলচ্চিত্র। গত কয়েক দশকে নারীপ্রধান গল্পের সিনেমা শুধু নির্মিতই হয়নি, বরং দর্শক, সমালোচকদের প্রশংসা এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে রইল তেমনি কয়েকটি সিনেমার কথা–

নারী চরিত্রের প্রথম উত্থান
বাংলা সিনেমায় নারীপ্রধান চরিত্রের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ষাটের দশকেই যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে সালাউদ্দিনের ‘রূপবান’ ছিল সেই সময়ের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। লোককথা অবলম্বনে নির্মিত ছবিটিতে ছিল এক নারীর জীবনসংগ্রাম, ভালোবাসা এবং ত্যাগের কাহিনি। সত্তরের দশকে এসে নারীকেন্দ্রিক গল্প আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছিল সেই সময়ের সমাজবাস্তবতার এক অনন্য দলিল। একই বছরে আবদুল্লাহ আল মামুন নির্মাণ করেন ‘সারেং বউ’। এক জেলেপল্লির নারীর জীবনসংগ্রামের কাহিনি। সিনেমার নবিতন চরিত্রটিও ছিল অসহায়তা, সামাজিক বঞ্চনা এবং প্রতিরোধের এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি। এই ধারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’। পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে এক অসহায় মায়ের জীবনসংগ্রামের গল্প বলা হয় এখানে।

বেঁচে থাকার লড়াইয়ে
আশির দশকে নারীর সংগ্রামের গল্প আরও তীব্রভাবে দেখানো হয়। ‘ভাত দে’ সিনেমায় আমজাদ হোসেন তুলে ধরেন সমাজের প্রান্তিক এক নারীর করুণ বাস্তবতা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর বেঁচে থাকার লড়াই। নব্বইয়ের দশকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রে নারীর চরিত্র নতুন তাৎপর্য পায় চাষী নজরুল ইসলামের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’-এ। এ সিনেমায় সুচরিতা অভিনীত বুড়ি চরিত্রটি দেশের জন্য নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করার যে মানসিক শক্তি দেখায়, তা বাংলা সিনেমায় নারীর আত্মত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। ২০০৬ সালে আবু সাইয়ীদের ‘নিরন্তর’ নতুন প্রজন্মের দর্শকদের সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে।

সমসাময়িক সময়ে
একুশ শতকে নারীপ্রধান চলচ্চিত্রের ধারা আরও শক্তিশালী হয়। ২০১১ সালে নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক সাহসী নারীর গল্প বলে। এরপর আসে ‘সুতপার ঠিকানা’। প্রসূন রহমানের এই ছবিতে একজন নারীর আত্মপরিচয় খোঁজার যাত্রা তুলে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সিনেমাকে নতুনভাবে পরিচিত করে দেয় ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। ২০২১ সালে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের এই ছবি কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আঁ সার্তে রিগা’ বিভাগে নির্বাচিত হয়। এক সাধারণ মেডিকেল কলেজ শিক্ষিকার জীবনের অস্বস্তিকর এক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি নারীর নীরব ক্ষোভ ও সামাজিক বাস্তবতার গভীর দিক তুলে ধরে।

নতুন সময়ের বৈচিত্র্য
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীপ্রধান গল্পের বৈচিত্র্য আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২২ সালে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ সিনেমায় ‘গুলতি’ চরিত্রটি সমুদ্রজীবনের এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক আবহ তৈরি করে। একই বছরে রুবাইয়াত হোসেনের ‘শিমু’ পোশাক শ্রমিক এক নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সামনে আনে। মাহমুদ দিদারের ‘বিউটি সার্কাস’ দেখায় এক সার্কাস শিল্পীর জীবনসংগ্রাম ও প্রতিরোধের গল্প। শঙ্খ দাশগুপ্তের ‘প্রিয় মালতী’ গ্রামীণ এক নারীর জটিল জীবনযাত্রা তুলে ধরে। মাকসুদ হোসাইনের ‘সাবা’ মা-মেয়ের সম্পর্কের মানসিক টানাপোড়েনকে বাস্তবধর্মীভাবে উপস্থাপন করে।

শুধু বাস্তবধর্মী সিনেমায় নয়, মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমাতেও নারীপ্রধান চরিত্র এখন প্রতিষ্ঠিত। ‘অগ্নি’, ‘দেবী’ ও ‘বিজলী’র মতো ছবিতে নারী চরিত্রকে অ্যাকশন ও ফ্যান্টাসির কেন্দ্রে দেখা গেছে। এসব ছবিতে নারীরা শুধু প্রেমের গল্পের অংশ নন, বরং গল্পের চালিকাশক্তি।

অন্যদিকে ইতিহাস ও সাহিত্যের চরিত্র নিয়েও নির্মিত হয়েছে নারীপ্রধান চলচ্চিত্র। যেমন কবি চন্দ্রাবতীর জীবন অবলম্বনে ‘চন্দ্রাবতী কথা’ সিনেমায় দেখা যায় ষোড়শ শতকের এক প্রতিভাবান নারীর বেদনাময় জীবনকাহিনি ও তাঁর সাহিত্য সাধনা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, একসময় যে সিনেমার জগৎ ছিল নায়ককেন্দ্রিক, আজ সেখানে নারীর সংগ্রাম সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। বাস্তবধর্মী গল্প, শক্তিশালী অভিনয় ও নতুন নির্মাণশৈলী এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন গল্প, নতুন চরিত্র ও নতুন নির্মাণশৈলীতে এই ধারার বিস্তার ঘটবে– এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম