শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ফ্যামিলি ম্যান-৩: সেই হাতিরাম, নাগাল্যান্ড আর প্রোপাগান্ডা

বিনোদন ডেস্ক   |   সোমবার, ২৪ নভেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৩৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ফ্যামিলি ম্যান-৩: সেই হাতিরাম, নাগাল্যান্ড আর প্রোপাগান্ডা

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের (সেভেন সিস্টার্স) রাজ্য নাগাল্যান্ডে শান্তি স্থাপন নিয়ে এক শীর্ষ রাজনীতিবিদ খুন। নয়াদিল্লি থেকে তদন্তে গেলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো একটি পক্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হলো। সামনে এলো মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার বৈশ্বিক চক্র। তদন্ত কর্মকর্তাদের একজনকে (কেন্দ্রীয় চরিত্র) দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। গল্প গড়াল ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জন ও সম্মান পুনরুদ্ধারের দিকে।

গত জানুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া পাতাল লোক-২, আর চলতি সপ্তাহের দ্য ফ্যামিলি ম্যান-৩; কয়েক মাসের ব্যবধানে মুক্তি পাওয়া সিরিজ দুটির গল্পের ক্ষেত্র ও বর্ণনার কাঠামো প্রায় একই। মিল আছে প্রোপাগান্ডা প্রচারের ধরনেও। পার্থক্য বলতে, পাতাল লোকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাতিরাম চৌধুরী (জয়দীপ আহলাওয়াত) ফ্যামিলি ম্যানে এসে ভিলেন হয়েছেন।

২০১৯ সালে দ্য ফ্যামিলি ম্যান যখন মুক্তি পেল তখন, ভারতীয় থ্রিলার সিরিজ উপস্থাপনার দিক থেকে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছিল। ২০২৫ সালে এসে এটি যেন বলিউডের একটি চক্রে আটকে গেছে। এক সময়কার হিন্দি সিনেমায় ঘুরে ফিরে অপরাধ চক্রের আস্তানা দেখানো হতো কাশ্মীরে। ২০১৯ সালে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর সেই ধারা কিছুটা বদলে গেছে। এখন অপরাধের আস্তানা দেখানো হচ্ছে উত্তরপূর্ব ভারতে। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া আয়ুষ্মান খুরানার ‘অ্যানেক’ দিয়ে শুরু। এরপর একে একে এলো পাতাল লোক-২, দিল্লি ক্রাইম-৩ ও ফ্যামিলি ম্যান-৩।

কিন্তু এই পরিবর্তনে আদতে কি কিছু বদলে গেছে? ছবির ক্যানভাস বদলে গেছে। কিন্তু বিরোধীদের ক্ষোভকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানানো, সরকারমুখী সাংবাদিকতার চরিত্র, নায়কের জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের মাধ্যমে গল্পের সমাপ্তির মসলাগুলো আগের মতোই আছে। ফলে, পর্দায় আমরা স্থানীয়দের প্রতিনিধিদের কেবল অপরাধ চক্রের সদস্য হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। সাধারণ মানুষের সংগ্রাম আড়ালে ঢাকা পড়ছে। কেন্দ্রীয় সরকার হাজির হচ্ছে অপরাধ দমনকারী ত্রাতার ভূমিকায়।

বিস্ফোরণের পর শান্তি কামনা
মৌসুম-৩ এর শুরুতেই দেখতে পাই, নাগাল্যান্ডের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণ হলো। পরের দৃশ্যে কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীকান্তের (মনোজ বাজপেয়ি) বাসায় চলছিল প্রার্থনা অনুষ্ঠান। যেটির উদ্দেশ্য ঘরে শান্তি বয়ে আনা। কেন্দ্র ও প্রান্তের ধারণা থেকে আপনি চাইলেই এই দুই দৃশ্যের একক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন। ধরে নিতে পারেন, সাত পর্বের সিরিজের শুরুতেই একটি বার্তা দেওয়া হলো- প্রান্তিক পর্যায়ের অশান্তি নিরসনে কেন্দ্র শান্তির দূত হয়ে আসবে। এপিসোডের নাম ‘দ্য পিস প্রবলেম’ রাখাটাও সেই ইঙ্গিত দেয়।

পরের দৃশ্যগুলোতে তাই হলো- নাগাল্যান্ডের এক নেতার সঙ্গে শান্তি চুক্তির আলোচনা করতে কোহিমায় যান শ্রীকান্ত। যাতে বাধাদানকারী হিসেবে দেখানো হয় স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো একটি সংগঠনকে। এর কিছুক্ষণ পরই হামলায় নিহত হন শ্রীকান্তের বস ও নাগাল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতা। জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয় বিরোধীদের দিকে। হামলার দৃশ্যের আগ মুহূর্তে পর্দায় হাজির হন রুকমা (জয়দীপ আহলাওয়াত)। পাতাল লোক-২ সিরিজে যাকে নাগাল্যান্ডে দেখা গিয়েছিল হাতিরাম চৌধুরী নামে পুলিশের চরিত্রে।

হাতিরামের সেই নাগাল্যান্ড সফর ছিল স্থানীয় এক নেতাকে হত্যা ও মাদক রহস্য উদঘাটনের জন্য। ফ্যামিলি ম্যানে তাঁকে দেখা গেল, মাদক চোরাকারবারী ও হত্যাকারী হিসেবে। এই রুকমার মাধ্যমেই পর্দায় আসে একটি বৈশ্বিক অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্র। যারা নাগাল্যান্ডে শান্তি চুক্তি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিপরীতে সরকারকে বাধ্য করে তাদের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি করতে। ভারতীয় বয়ানে উঠে আসে নাগাল্যান্ড ঘিরে চীন ও মায়ানমারের ভূমিকাও।

শ্রীকান্তে হাতিরামের ছায়া
শান্তি চুক্তি, অস্ত্র ব্যবসার ফাঁকে ফাঁকে সিরিজে দম ফেলার জায়গা বানানো হয়েছে শ্রীকান্তের পারিবারিক গল্পকে। আগের দুই মৌসুমের মতোই, জেকে’র (শরীব হাশমি) সঙ্গে শ্রীকান্তের খুনসুটি হাস্যরস জাগায়। দুই ছেলেমেয়ে আথর্ব ও ধৃতি হয়ে উঠেছে আলফা জেনারেশনের প্রতিনিধি। আর স্ত্রী সুচির (প্রিয়ামণি) সঙ্গে শ্রীকান্তের রসায়ন দেখায়, মধ্যবিত্ত পরিবারের মানসিক সংকট।

পরিবারের কর্তার চরিত্রে শ্রীকান্ত পাতাল লোকের হাতিরামের মতোই সংযত। আবার ভিলেনের চিরত্র হলেও রুকমার ভেতর এক সময় পরিবার গঠনের বাসনা জাগে। এখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর পারিবারিক সত্তা তুলে ধরে পরিচালক কেবলই সিরিজের নামের যথার্থতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি ফ্যামিলি ম্যান-৩ এর স্মরণীয় দৃশ্যগুলো মনে করার চেষ্টা করি, খুব সম্ভবত পাতাল লোক-২ এর দৃশ্যই আগে মাথায় আসবে। দুই সিরিজের পারিবারিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ান এতটাই একে-অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।

কিছু গোজামিল
সিরিজের গোজামিল দেওয়া অংশ পার্শ্বচরিত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। যেমন, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর (সীমা বিশ্বাস) দপ্তরে এক ছোট আলাপচারিতাতেই সিস্টেমের ভেতরের গাদ্দার চরিত্র প্রকাশ্যে আসে। ফলে গল্পের রহস্য সেখানেই কিছুটা ফাঁস হয়ে যায়। আবার শ্রীকান্তের তদন্ত দলের সদস্য জয়া আলীর চরিত্র খুবই হালকা রহস্যের। এই চরিত্রের রূপ বদলের যুক্তিও অযৌক্তিক লাগে। গল্পের বিশেষ কিছু মুহূর্তে হুট করে নতুন চরিত্র হাজির করা হয়। যাদের উপস্থিতি অনেকটা প্রচলিত তামিল সিনেমার অলৌকিক দৃশ্যের মতো। একেবারে শেষ দিকে শ্রীকান্তের বন্ধু হিসেবে হাজির করা হয় মাইকেলকে (বিজয় সেতুপতি)।

গত কয়েক বছরে মুক্তি পাওয়া সিরিজগুলোতে শেষ মুহূর্তে বড় তারকা হাজির করা যেন ট্রেন্ড হয়ে গেছে। সেদিক থেকে বিজয়ের উপস্থিতিকে চমক হিসেবে দেখা যায়। তবে এই উপস্থিতির যুক্তি খুঁজতে চাইলে দেখতে হবে ফারজি (২০২৩) নামের সিরিজ। যেখানে একটি দৃশ্যে মাইকেলকে শ্রীকান্ত নামে এক ব্যক্তির দারস্ত হতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ফ্যামিলি ম্যান-৪ এ এই দুজনের যোগসূত্র স্পষ্ট করা হবে।

শেষ কথা
সপ্তম এপিসোডে গল্প হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যায়। ফলে দর্শক মনে একটা অসম্পূর্ণতার অনুভূতি কাজ করে। আবার শেষটা তেমন উত্তেজনাও তৈরি করে না। বরং মায়ানমার থেকে কয়েক ভারতীয় সেনাকে উদ্ধার অভিযানের দৃশ্যে জাতীয়তাবাদের মসলা মেশানো হয়েছে। মোট কথা, ফ্যামিলি ম্যান-৩-এ আগের দুই সিজনের মতো উথাল-পাতাল উত্তেজনায় ভরপুর কিছু নেই। যা আছে, সেগুলোর রহস্য সহজেই অনুমান করা যায়।

২১ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া সিরিজটি দেখা যাবে প্রাইম ভিডিওতে।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম