বিনোদন ডেস্ক | শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বাংলা অভিনয়ের ইতিহাসে কিছু নাম উচ্চারণ করলেই যেন ভেসে ওঠে একেকটি সময়, একেকটি আবহ। হুমায়ূন ফরীদি তেমনই এক নাম। যিনি শুধু অভিনয় করেননি, অভিনয়ের সংজ্ঞাটাকেই অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর কণ্ঠ, চোখের ভাষা, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য।
আজ ২৯ মে। কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মদিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্ম নিয়েছিলেন হুমায়ূন কামরুল ইসলাম, যিনি পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের অভিনয়জগতের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব—হুমায়ূন ফরীদি।
১৯৬৮ সালে ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে ভর্তি হলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর শিক্ষাজীবনে বিরতি আনে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে। সেই পরিচয়ই তাঁকে টেনে আনে নাটকের জগতে। মঞ্চনাটকের দল ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে শুরু হয় তাঁর অভিনয়জীবনের প্রকৃত পথচলা।
মঞ্চই তাঁকে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে আরও পরিণত অভিনেতা হয়ে উঠতে শিখিয়েছিল। আর সেই শিক্ষাই পরবর্তী সময়ে তাঁকে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে এনে দেয় অন্যরকম উচ্চতা।
আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে হুমায়ূন ফরীদির আবির্ভাব ছিল যেন নতুন এক ঝড়। তিনি শুধু অভিনয় করতেন না, চরিত্রকে নিজের শরীর ও কণ্ঠে ধারণ করতেন।
তাঁর অভিনীত ‘সংশপ্তক’-এর ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রটি আজও বাংলা নাটকের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। একইভাবে ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘নিকষ অন্ধকার’, ‘শীতের পাখি’-সহ অসংখ্য নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে দশকের পর দশক।
খলচরিত্রকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে, দর্শক একইসঙ্গে তাঁকে ভয়ও পেত, আবার তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধও হতো।
বাংলা চলচ্চিত্রে একসময় খলনায়ক মানেই ছিল উচ্চস্বরে সংলাপ আর অতিনাটকীয়তা। হুমায়ূন ফরীদি সেই ধারা বদলে দেন। তিনি খলচরিত্রকে করেন মনস্তাত্ত্বিক, বুদ্ধিদীপ্ত এবং বাস্তব।
নব্বইয়ের দশক থেকে চলচ্চিত্রে তাঁর শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। ‘দহন’, ‘বাচ্চু বাদশাহ’, ‘সন্ত্রাস’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘মাতৃত্ব’, ‘জয়যাত্রা’-সহ বহু চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।
২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে।
পর্দার বাইরে হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং স্পষ্টভাষী মানুষ। তবে তাঁর জীবনে ছিল একধরনের নিঃসঙ্গতাও। অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল। ১৯৮৪ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ ঘটে।
জীবনের নানা টানাপোড়েন তাঁর ব্যক্তিত্বে একধরনের বিষণ্নতা তৈরি করেছিল, যা অনেক সময় তাঁর সাক্ষাৎকার কিংবা অভিনয়ের মধ্যেও ফুটে উঠত।
হুমায়ূন ফরীদিকে শুধু অভিনেতা বললে কম বলা হয়। তিনি ছিলেন অভিনয়ের এক প্রতিষ্ঠান। তাঁর সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি, বিরতির ব্যবহার—সবকিছুই ছিল স্বতন্ত্র।
তিনি বুঝিয়েছিলেন, অভিনয় মানে শুধু সংলাপ বলা নয়। অভিনয় মানে চরিত্রকে বাঁচিয়ে তোলা। ফলে আজকের দিনে অনেক অভিনেতার অভিনয়ে তাঁর প্রভাব স্পষ্ট।
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির বাসায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন হুমায়ূন ফরীদি। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে থামাতে পারেনি। তিনি এখনো বেঁচে আছেন বাংলা নাটকের প্রতিটি শক্তিশালী দৃশ্যে, চলচ্চিত্রের প্রতিটি স্মরণীয় সংলাপে এবং দর্শকের আবেগে।