আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ২৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলার পরিকল্পনা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনেকে বলছেন, এতে সংঘাত ও শান্তির মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, লড়াই এখনো চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক তৎপরতা বর্তমানে স্থলভাগ থেকে সাগরে সরে গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে দুই পক্ষই নিজেদের জারি করা অবরোধ কার্যকরে মরিয়া হয়ে উঠেছে। একই সময়ে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান দ্বিতীয় দফা সংলাপের চেষ্টা চালাচ্ছে। যেখানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও জলপথকেন্দ্রিক হুমকি ও শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এটি যেন বাস্তবে রূপ নেওয়া এক ‘গানবোট কূটনীতি’ (নৌ শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি গানবোট ডিপ্লোমেসি নামে পরিচিত)।
প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়ে ও জাহাজ আটক করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করে রেখেছে। নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অভিযানের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে দিতে চাইছে। অবরোধের কারণে উৎপাদিত তেল রপ্তানি যত ব্যাহত হবে, মজুত করার জায়গাও তত কমে যাবে।
হরমুজ এখন দুই দেশের শক্তি পরীক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উভয়ই মনে করছে সময় তাদের পক্ষে আছে। যেমন, ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি-এজেই বলেছেন, ‘শত্রু আমাদের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার অবস্থানে নেই।’ অপরদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে খার্গ দ্বীপে তেল মজুতের কেন্দ্র পূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে ইরান তেল উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবে। সামুদ্রিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত করার মধ্য দিয়ে দেশটির সরকারের প্রধান আয়ের উৎসে সরাসরি আঘাত করছে যুক্তরাষ্ট্র।
হরমুজ শক্তি নয়, দুর্বলতা
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বিরোধী থিঙ্কট্যাংক হিসেবে পরিচিত ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিস (এফডিডি)’। ওয়াশিংটনভিত্তিক এই সংস্থার গবেষকদের যুক্তি- হরমুজ প্রণালি তেহরানের জন্য কোনো ‘গেম চেঞ্জিং’ হাতিয়ার নয়। বরং এটি তাদের অন্যতম দুর্বলতা। এফডিডির বিশ্লেষণ বলছে, আগামী রোববারের (২৬ এপ্রিল) মধ্যে ইরানের তেল মজুতের সক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘রিয়েল ক্লিয়ার ডিফেন্স’ নামের ওয়েবসাইটে অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা ল্যান্স বি গর্ডন লিখেছেন, মজুতের জায়গা না থাকায় ইরান যদি উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে। যেমন- তেলক্ষেত্রের শিলাস্তরের ছিদ্র বন্ধ বা সুরু হওয়া, পানি জমা ইত্যাদি। এসব কারণে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও আয় স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে।
তেলক্ষেত্রে জোরপূর্বক উৎপাদন স্থগিত রাখা হলে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এফডিডির প্রধান নির্বাহী মার্ক দুবোভিটজ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল হলো একদিকে যুদ্ধবিরতি, অন্যদিকে চাপ বাড়ানো। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জাহাজ আটক করার মাধ্যমে সেই চাপ আরও তীব্র করছে।
এমন অবস্থায় শান্তি আলোচনার প্রস্তুতি, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর এবং নতুন করে হামলার পরোক্ষ হুমকির মতো ঘটনা পাশাপাশি চলছে। ইরান বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল বোঝে। এটিকে ব্যর্থ করে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে। এর অংশ হিসেবে তারা নৌ অবরোধ না ওঠা পর্যন্ত আলোচনায় অংশ নিতে চাইছে না।
ইরানের চাপও কাজে দিচ্ছে
কার্গো ট্র্যাকিংয়ের প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সা জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৩৪টি ট্যাংকার এ পর্যন্ত নৌ অবরোধ এড়িয়ে চলাচল করেছে। এর মধ্যে ১৯টি উপসাগর থেকে বেরিয়ে গেছে। আরব সাগর থেকে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে ১৫টি। উপসাগরের বাইরে যাওয়া ৬টি ট্যাংকারে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। সেগুলো থেকে অন্তত ৯১ কোটি ডলার আয় সম্ভব।
অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরোপ করা নিজস্ব অবরোধ (জাহাজ চলাচল বন্ধ) কাজ করছে কি না, তা বুঝতে ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টের দিকে তাকানোই যথেষ্ট। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বোঝাতে ট্রুথ সোশ্যালে তিনি নিয়মিত পোস্ট দিলেও তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এর বাইরে আরও কিছু লক্ষণ আছে। জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্যের কারণে জার্মানির বৃহত্তম উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা লুফথানসার ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে তেলের মজুত কমছে। তামা ও কনডমের দামও বাড়ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো জ্বালানি মূল্যস্ফীতি সামলাতে বাড়তি খরচ করতে বাধ্য হচ্ছে। এমনকি এর প্রভাব কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয়ের স্বপ্ন দেখছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্ররাও তেল উৎপাদন নিয়ে বিপাকে আছেন। তাদের ইঙ্গিত করে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মহাকাশ প্রতিরক্ষা শাখার কমান্ডার মাজিদ মুসাভি বলেছেন, নিজেদের ভূখণ্ডকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দিলে প্রতিবেশীদের উচিত তেল উৎপাদনের আশা ছেড়ে দেওয়া।
তুরুপের তাস, আছে ঝুঁকি
ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাদের হাতে আরও কিছু তুরুপের তাস আছে। আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট তাসনিম নিউজ এজেন্সি সম্প্রতি সাগরে থাকা ইন্টারনেট কেবল বিচ্ছিন্নের সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে মধ্যপ্রাচ্যের ইন্টারনেট বিঘ্নিত ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে ধস নামতে পারে।
তবে এভাবে যুদ্ধের পরিসর বাড়াতে থাকলে ইরানের ভেতরেও ক্ষোভ দানা বাঁধতে পারে। সাধারণ ইরানিদের ওপর যে যুদ্ধের চাপ বেড়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। নিরাপত্তার কারণে সরকার নিজেই অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রেখেছে। এতে কয়েক হাজার তরুণ উদ্যোক্তা বেকার হয়েছেন।
সংস্কারপন্থী ইরানি লেখক আহমাদ জেইদাবাদির মতে, চলমান সংকট থেকে উত্তোরণের বিকল্প নিয়ে এখন আলোচনা করা দরকার। যাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তিসঙ্গত একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।