আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ইরানের পার্লমেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় উঠে আসছেন। চলমান যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাকিস্তানের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি গালিবাফকেও ইসরায়েলের ‘হিট লিস্ট’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের সূত্রটি বলেছে, ‘ইসরায়েলিদের কাছে তাদের অবস্থান জানা ছিল এবং তারা তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি, যদি তাদেরও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, তাহলে কথা বলার মতো আর কেউ থাকবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের পিছিয়ে যেতে বলেছে।’
যদিও ৬৪ বছর বয়সী এই ব্যক্তি শত্রুদের সতর্ক করেছেন, ‘আমাদের ভূমি রক্ষার সংকল্পকে’ পরীক্ষা না করার জন্য এবং এক্স পোস্টে ‘অবিরাম হামলার’ হুমকি দিয়েছেন। তবে মার্কিন মিডিয়া আউটলেট পলিটিকোর মতে, কিছু মার্কিন কর্মকর্তা তাঁকে দিয়ে কাজ চালানো যায়, এমন একজন অংশীদার হিসেবেই দেখে থাকেন।
গালিবাফ অতীতে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু যেহেতু মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন, তাই অভিজাত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং একজন বাস্তববাদী, কিন্তু কট্টরপন্থী হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষমতার এক নতুন স্তরে পৌঁছে দিতে পারে।
‘লাঠি ব্যবহার করতে পেরে গর্বিত’
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির মালিকানাধীন আরবি ভাষার টিভি চ্যানেল আল-আলামের তথ্য অনুযায়ী, গালিবাফ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোরঘাবেহর একটি ধর্মপ্রাণ, শ্রমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
গালিবাফের জন্মস্থান মাশহাদের কাছাকাছি, যেখানে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বসবাস করতেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি মাশহাদের প্রধান মসজিদগুলোয় ইরানের তৎকালীন ভবিষ্যত সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ অন্যান্য বিপ্লবী আলেমদের ক্লাসে অংশ নিতে শুরু করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই গালিবাফ ইরাক যুদ্ধে অংশে নেন এবং ২০ বছর বয়সে আইআরজিসিতে যোগ দেন। দুই বছর পর তিনি এই বাহিনীর একটি কমব্যাট ডিভিশনের কমান্ডার হন। ১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
আল-আলামের তথ্যমতে, গালিবাফ আইআরজিসি কমান্ডার হওয়ার বছরেই বিয়ে করেন এবং সেই বিয়ে পরিচালনা করেছিলেন সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি। এই দম্পতির তিন সন্তান আছে। যুদ্ধের পর গালিবাফ পদমর্যাদায় আরও ওপরে উঠতে থাকেন এবং ১৯৯৭ সালে আইআরজিসি বিমান বাহিনীর কমান্ডার হন।
১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে একটি সংস্কারপন্থী সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে ছাত্র বিক্ষোভে ইসলামী প্রজাতন্ত্র উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলনটি সহিংসভাবে দমন করা হয়, যার ফলে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয় এবং ধারণা করা হয় যে গালিবাফ ব্যক্তিগতভাবে এই দমন অভিযানে জড়িত ছিলেন।
ফাঁস হওয়া একটি অডিও ফাইলে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এখন ১০০০ সিসির মোটরবাইকে লাঠি হাতে আমার একটি ছবি আছে… যেখানেই রাস্তায় নেমে আসা এবং লাঠি ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়, আমরাই তারা যারা সেটা করি। এবং আমরা এতে গর্বিত।’
বিক্ষোভের পর আইআরজিসির চব্বিশ জন কমান্ডার তৎকালীন ইরানের রাষ্ট্রপতি ও সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ খাতামিকে কড়া ভাষায় লেখা একটি চিঠিতে আইআরজিসির হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। গালিবাফ বলেন, তিনি সেই দুজন কমান্ডারের একজন ছিলেন, যারা চিঠিটির খসড়া তৈরি করেছিলেন এবং স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন।
অনেকেই এই চিঠিটিকে রাজনৈতিক বিষয়ে আইআরজিসির প্রভাবের একটি স্পষ্ট ঘোষণা হিসেবে দেখেন- যা তখন থেকে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
পুলিশ প্রধান থেকে তেহরানের মেয়র
ছাত্র বিক্ষোভের এক বছর পর ৩৯ বছর বয়সে গালিবাফ পুলিশ প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর পাঁচ বছরের কার্যকালে, তিনি একটি জাতীয় জরুরি পুলিশ হটলাইন স্থাপন করেন এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়াকে সহজ করেন।
পুলিশ বাহিনীকে বিদেশি যানবাহন দিয়ে সজ্জিত করাকে তিনি তাঁর সেরা অর্জন হিসেবে গর্ব করতেন। যদিও সমালোচকদের মতে, এটা ছিলো অনেক ব্যয়বহুল।
২০০৫ সালে গালিবাফ পুলিশ প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর, তিনি তেহরানের সিটি কাউন্সিল কর্তৃক মেয়র হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ১২ বছর এই পদে ছিলেন এবং এখনও রাজধানীর মেয়র হিসেবে দীর্ঘতম মেয়াদের রেকর্ডটি তাঁর দখলে আছে।
যানজটপূর্ণ রাজধানীতে মেট্রো ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ‘সদর এক্সপ্রেসওয়ের’ মতো পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়নের কৃতিত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে ‘বিপুল মূল্যের সম্পত্তি’ কেলেঙ্কারির পর গালিবাফের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়, যেখানে সিটি কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে শত শত সম্পত্তি বাজার মূল্যের চেয়ে পঞ্চাশ শতাংশ পর্যন্ত বিশাল ছাড়ে বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে।
গালিবাফ ক্ষমতা ছাড়ার কয়েক মাস আগে, ইরানের অন্যতম প্রাচীন উঁচু ভবন, ১৭ তলা বিশিষ্ট প্লাস্কো বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে সেটি ধসে পড়ে এবং এতে অন্তত ২০ জন দমকলকর্মী নিহত হন। ওই দুর্ঘটনাটি গালিবাফের নেতৃত্বে নগর সরকারের মধ্যে পদ্ধতিগত অবহেলাকে তুলে ধরে।
তবে এরপরও কোনো কেলেঙ্কারির কারণেই গালিবাফকে বরখাস্ত বা এমনকি অভিশংসনও করা হয়নি এবং তিনি রেহাই পেয়ে যান। ২০২০ সালে তিনি পার্লমেন্ট নির্বাচনে একটি আসন জিতে স্পিকার হন।