শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ইরানে যৌথ হামলা: চীন-রাশিয়া কেন ‘সাইডলাইনে’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ইরানে যৌথ হামলা: চীন-রাশিয়া কেন ‘সাইডলাইনে’

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে, ‘চীন-রাশিয়া চুপ কেন?’ এর উত্তর লুকিয়ে আছে দুটি কূটনৈতিক ও আইনি শব্দের মধ্যে- অংশীদার ও মিত্র।

সামরিক হস্তক্ষেপ না করার প্রধান কারণ হলো বেইজিং ও মস্কো কেবল ইরানের ‘কৌশলগত অংশীদার’। বিপরীতে ইসরায়েলের আছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘কৌশলগত অভিভাবক বা মিত্র’। ফলে ইরানের শাসকদের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হুমকির অভিযোগ তুলে তেল আবিবের চালানো হামলায় ওয়াংশিংটনও অংশ নিয়েছে।

বিপরীতে তেহরানের ‘বন্ধু’ হিসেবে পরিচিত মস্কো ও বেইজিং কেবল হামলা ও আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এমনকি শনিবার সকালের ঘটনার পর তেহরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা মস্কোর নম্বরে কলও করেছিলেন। রুশ সরকারের বিবৃতি অনুযায়ী, ফোনের অপরপাশ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ কেবল সহানুভূতি ও মৌখিক সমর্থনের কথা জানান।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, ল্যাভরভের সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। তারা একমত হন- একটি সার্বভৌম দেশের নেতাকে ‘নির্লজ্জভাবে হত্যা’ এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উসকানি দেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’। নিন্দা জানিয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিনও। তবে শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়ার তথ্য জানা যায়নি।

কোন পর্যায়ে গিয়ে কোনো দেশ দ্বিতীয় পক্ষের হয়ে সংঘাতে জড়ায় বা বিরত থাকে তা বুঝতে এসব দেশগুলোর মধ্যে হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তারা অংশীদার মিত্র নয়
গত বছরের ১৭ জানুয়ারি ইরানের সঙ্গে রাশিয়া ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এতে সামরিক সম্পর্ক বাড়লেও যৌথ প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার কথা নেই। চুক্তি অনুযায়ী, হামলার সময় রাশিয়ার ভূমিকা কেবল পরামর্শ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। আইনিভাবে অংশীদার হওয়ায় রাশিয়া ইরানকে কেবল সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে, সৈন্য নয়।

চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক নিকিতা স্মাগিন সিএনএনকে বলেছিলেন, এটি কেবল ‘সমর্থন দেখানোর প্রদর্শনী’। ইরানিরা ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলকে নিয়ে আতঙ্কিত। তারা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন ও হিজবুল্লাহর বিপর্যয় নিয়ে শঙ্কিত। ফরেন পলিসির বিশ্লেষকদের ধারণা, তথাকথিত এই ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অন্তর্ভুক্ত প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হওয়াতেই তেহরান মস্কোর দিকে ঝুঁকেছে।

অপরদিকে চীনের সঙ্গে ইরানের সহযোগিতামূলক বড় চুক্তিটির মেয়াদ ২৫ বছরের। ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় ২০২১ সালে। এর মাধ্যমে চীন ইরানকে ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’ হিসেবে গণ্য করে। তবে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক অভিধানে এর অর্থ হলো-‘আমরা কেবল বাণিজ্য সহযোগিতা সমন্বয় করব’।

চুক্তিটি নিয়ে ইরানি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক গাজাল ভাইসি মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের নিবন্ধে লিখেছিলেন, তেহরানের সাধারণ মানুষ ধারণা করেছিল এটি ইরানি শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এর বিনিময়ে বেইজিং তেহরানের বাজারে সস্তা পণ্য ঢোকাবে। তাতে ইরানের চেয়ে চীনই বেশি লাভবান হবে।

মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকির মুখে গত ২৯ জানুয়ারি চীন, রাশিয়া ও ইরান একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে। এর লক্ষ্য ছিল কারো একতরফা জবরদস্তি প্রত্যাখ্যানের রূপরেখা তৈরি। মিডল ইস্ট মনিটর বলছে, এটি ছিল মূলত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি চুক্তি। ন্যাটোর মতো কোনো যুদ্ধকালীন জোট গঠনের নয়।

ন্যাটোর আর্টিকেল-৫ অনুযায়ী, সদস্যভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে বাকিরা তাদের হয়ে লড়াই করে। যা প্রকৃত মিত্র দেশের একটি নমুনা। কিন্তু তেহরানের সঙ্গে বেইজিং কিংবা মস্কোর সম্পর্ক তেমন নয়।

‘একটি দীর্ঘমেয়াদি খেলা’
শনিবারের সংঘাত শুরুর পরপরই জরুরি অধিবেশন ডাকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। এর স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাশিয়া ও চীন ইরানের জন্য কূটনৈতিক ঢাল ঠিকই, কিন্তু সেই ঢাল ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পারছে না।

জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এটি রাষ্ট্রগুলোকে ‘ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত আত্মরক্ষার’ অধিকার দেয়। রাশিয়া ও চীন তাদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমোদন বা নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ঠেকাতে পারে। তবে ভেটো দিয়ে বাস্তব কোনো একতরফা হামলা থামানো সম্ভব নয়।

ইরানের বন্ধুদের এমন পরিস্থিতি নিয়ে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থিংক-ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো আহমেদ আবুদুহ লিখেন, কারো কারো কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মুখে চীনের সংযম নিরপেক্ষ অবস্থান মনে হতে পারে। কিন্তু এটি জোরালো করে যে, চীন আসলে একজন অনির্ভরযোগ্য অংশীদার।

আহমেদ আবুদুহ লিখেন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল- তখনও চীনের নিষ্ক্রিয়তা একই বার্তা দেয়। চীন সবসময়ই ইরানকে সামরিকভাবে সমর্থন দেওয়া এড়িয়ে চলেছে। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় বেইজিং ইরান ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করেছিল ঠিকই, কিন্তু তেহরানকে কোনো বস্তুগত বা সামরিক সহায়তা দেয়নি।

চ্যাথাম হাউসের এই অ্যাসোসিয়েট ফেলোর মতে, চীন ইরানকে একটি ‘দীর্ঘমেয়াদী খেলা’ হিসেবে দেখে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ‘চাপ প্রয়োগের অভিযান’ অজান্তেই চীনকে সেই খেলায় জিততে সাহায্য করতে পারে।

অপরদিকে পলিটিকোর সাংবাদিক ইভা হার্টগ বলছেন, চার বছর আগে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্রেমলিন তথাকথিত ‘বহুমেরু বিশ্ব’ গড়ার আস্ফালন দেখিয়ে আসছে। কিন্তু যখনই তাদের বন্ধু দেশগুলোর নেতারা আক্রমণের শিকার হয়েছেন, সেই চূড়ান্ত মুহূর্তেও মস্কোর প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবে দুর্বল। সমর্থন ছিল কেবল প্রতীকী।

কোন স্বার্থে ‘দুর্বল’ প্রতিক্রিয়া
বেইজিং ও মস্কোর কাছে ‘অংশীদারত্ব’ একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কিন্তু ‘মিত্র’ হয়ে যুদ্ধে নামা তাদের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে ইরান যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করেছে, তার ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন। ওই বছর চীন প্রতিদিন গড়ে ১ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে। এটি তাদের সমুদ্রপথে আমদানি করা মোট ১০ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের প্রায় ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।

অপরদিকে রাশিয়া ইরানের ড্রোনের অন্যতম বড় ক্রেতা। দ্য কনভারসেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান তাদের ড্রোন ও প্রযুক্তি দিয়ে মস্কোকে সহযোগিতা করে। এর বিনিময়ে গত বছর তাদের মধ্যে ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে একটি সমঝোতাও হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান ও রাশিয়ার তেল গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে। চীনও তেলের জন্য এই দুই দেশের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়াটা তাদের নতুন করে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মুখে ফেলতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বনাম ২০২৬
বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনই বলে দেয় কেন ‘বন্ধু’ শব্দটির গুরুত্ব বদলে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) এবং চীন ছিল ‘মিত্রশক্তি’। অক্ষশক্তির (জার্মানি, জাপান, ইতালি) বিরুদ্ধে তারা একসঙ্গে লড়াই করে। কিন্তু ২০২৬-এর বাস্তবতা ভিন্ন।

বর্তমানে ওয়াশিংটন, মস্কো ও বেইজিং পরস্পরকে প্রতিদ্বন্দি হিসেবে দেখে। বিশ্বযুদ্ধের পর এই দীর্ঘ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হয়েছে ইসরায়েল। তাদের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি না থাকলেও পরস্পরকে ‘ডি-ফ্যাক্টো’ বা কার্যত মিত্র হিসেবে দেখে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’। যেটির আওতায় তারা ন্যাটোভুক্ত দেশের মতোই সুবিধা পায়।

অন্যদিকে, ইরানকে নিয়ে রাশিয়া ও চীনের লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের প্রভাব সীমাবদ্ধ করা। তেহরানের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করা কিংবা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা এই বন্ধুত্বের লক্ষ্য নয়। ধারণা করা হয়, এই ‘ত্রিশক্তি অক্ষের’ জন্য অংশীদারত্ব ঠিক ততক্ষণই কার্যকর, যতক্ষণ না মহাযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম