আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৩২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
শেষ হয়ে এলো ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ। বছরজুড়ে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে বন্যা, ঝড় ও ভূমিকম্পের মতো বিধ্বংসী ঘটনা বিশ্বকে অস্থির ও মানবিক সংকটের মুখে ফেলেছে। সব কিছু ছাপিয়ে এবার সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনা ছিল জোহরান মামদানির নিউইয়র্ক জয়।
নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হলেন জোহরান মামদানি
গত ৫ নভেম্বর নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন জোহরান মামদানি (৩৪)। এর মধ্যে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত নেতা নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচিত হলেন। গত ১০০ বছরের মধ্যে নিউইয়র্কের সর্বকনিষ্ঠ এ মেয়র মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ক্ষোভ, আশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমোকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। মামদানি প্রমাণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে সাধারণ মানুষও তাদের পছন্দের মানুষকে বেছে নিতে পারে; যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে মামদানি বলেছেন, নিউইয়র্কের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে, সামর্থ্যের মধ্যে থাকা একটি শহরের পক্ষে রায় দিয়েছে। সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বন্ধুরা, আমরা একটি রাজনৈতিক রাজবংশকে উৎখাত করেছি।’ নিউইয়র্ক শহরের নতুন জন্ম হয়েছে বলে তিনি বলেন।
নির্বাচনে জয়ী ঘোষণার পর আবেগঘন এক ভাষণে জোহরান তাঁর মা-বাবা ও স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন। জোহরান মা-বাবাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আজ আমি যে মানুষ হয়েছি, তা তোমাদের জন্যই। তোমাদের সন্তান হতে পেরে আমি গর্বিত।’ মামদানি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম। তাঁর মা ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার। বাবা কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের খ্যাতিমান অধ্যাপক মাহমুদ মামদানিও জন্মগতভাবে ভারতীয়।
স্ত্রী রামাকে উদ্দেশ করে জোহরান বলেন, ‘এই মুহূর্তে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তোমাকে পাশে পেতে চাই। এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় মুহূর্ত।’ নিউইয়র্ক সিটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ফার্স্ট লেডি ২৮ বছর বয়সী রামা দুয়াজি সিরীয় বংশোদ্ভূত। তিনি নিউইয়র্কভিত্তিক একজন চিত্রশিল্পী, যাঁর কাজে প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়বস্তু উঠে আসে। তাঁর শিল্পকর্ম বিবিসি নিউজ, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ভাইস এবং লন্ডনের টেট মডার্ন জাদুঘরে দেখা গেছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি
বছরের শুরুতেই আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। চীনের ওপর ১০০ শতাংশ এবং ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন তিনি। ভারতের ক্ষেত্রে এই শুল্কের মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিল রাশিয়া থেকে তেল কেনার ‘শাস্তি’। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। বিশেষ করে আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে শুল্কনীতি ঘিরে শুরু হয় নতুন করে ঠান্ডা লড়াইয়ের দর কষাকষি, যা বহু মানুষের মনে পুরোনো ঠান্ডাযুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
ইসরায়েল-হামাস শান্তিচুক্তি
একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আলোচনায় আসে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে শান্তিচুক্তির প্রসঙ্গ। ২০২৩-এর অক্টোবরে যখন হামাস ও ফিলিস্তিনের অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ নামে একটি বড় আকারের আক্রমণ শুরু করে। সংঘাতের আবহে শান্তির চেষ্টা চললেও পরিস্থিতি ছিল টানটান। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ইসরায়েল এবং হামাস একটি প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি এবং বন্দিবিনিময় চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল এবং ১৯ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ
এর মধ্যেই নজর ছিল রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধবিরতি আলোচনার দিকে। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ২০২৫ সালেও থামেনি। প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ, ধ্বংস হয়েছে বিপুল সম্পত্তি। একাধিক দফায় আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। যুদ্ধ থামার আশা তৈরি হলেও তা বারবার হতাশায় বদলে গিয়েছে।
পেহেলগাম হামলা নিয়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে অবনতি
দক্ষিণ এশিয়াতেও অশান্তি কম ছিল না। পেহেলগাম হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকে। সেই আবহেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ থামানোর দাবি সামনে আসে এবং তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার দাবি ঘিরে বছরজুড়ে বিতর্ক চলে।
এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তোলে পশ্চিমি দেশগুলো। এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে চাপ আরও বাড়ে। সুদানে দীর্ঘস্থায়ী সহিংসতা, বিশেষ করে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) হামলার ফলে দেশটিতে অসংখ্য নাগরিকের মৃত্যু এবং অভিবাসী হতে বাধ্য করেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা, এপস্টেইন ফাইলের তথ্য উন্মোচন এবং একাধিক অঞ্চলে জেনজিদের আন্দোলনের মতো ঘটনা ২০২৫ সালকে স্মরণীয় করে রাখার মতো।