শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ট্রাম্পে নাখোশ, ইউরোপের নতুন নেতা ফ্রিডরিখ মের্ৎসে!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৪৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ট্রাম্পে নাখোশ, ইউরোপের নতুন নেতা ফ্রিডরিখ মের্ৎসে!

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোর ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে কোনোভাবেই বাগে আনতে পারেননি। রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতে যাওয়ারও কোনো ইঙ্গিত দেননি তিনি। এই অবস্থায় ইউরোপের নেতাদের আশাভঙ্গ হয়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে যে প্রত্যাশা ছিল ইউরোপের, তা আর নেই।

বিশেষ করে ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসন থামাতে এখন আর ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করতে চান না ইইউ নেতারা। এই শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে এসেছে জার্মানি। ইউরোপের প্রতিরক্ষায় জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের দোড়ঝাঁপ তাকে ইউরোপের নতুন নেতায় পরিণত করেছে।

ফ্রিডরিখের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে নজর দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত আগস্টে জার্মান ফেডারেল মন্ত্রিসভা একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়। আর এই পরিষদের দায়-দায়িত্ব এখন ফ্রিডরিখের ওপরই পড়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালাইসিস (সিইউপিএ) বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেনের সংঘাতকেন্দ্রিক পরিস্থিতি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে এসেছে। এই অবস্থায় জার্মানি নীরবে এখন ইউরোপের প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছে।

ইউরোপের সুরক্ষায় পদক্ষেপ
সিইউপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন শান্তি আলোচনায়ও জার্মানি নতুন ভূমিকায় নেমেছে। ফ্রিডরিখের ডাকে সর্বশেষ গত ১৪-১৫ ডিসেম্বর বার্লিনে আলোচনায় বসে ইউরোপের দেশগুলো। এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করা এবং চাপ যাতে ইউরোপের দিকে না আসে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা।

২০২২ সালে বেলজিয়ামের বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ার রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২০০ বিলিয়ন ইউরোর সম্পদ জব্দ করে। এই সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে নানা আলোচনা ওঠে। গত ৫ ডিসেম্বর অল্প সময়ের নোটিশে ব্রাসেলসে উড়ে যান ফ্রিডরিখ। জব্দ সম্পদের ব্যবহার নিয়েই তার এই দৌড়ঝাঁপ। তিনি জব্দ সম্পদের অর্থ থেকে ইউক্রেনকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার পরামর্শ দেন।

এ নিয়ে সর্বশেষ গত ১৮-১৯ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে আরেকটি বৈঠক করেছেন ইউরোপের নেতারা। সেখানে ইউক্রেনকে রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ থেকে ৯০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তেও ফ্রিডরিখের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ওয়াশিংটনের প্রতি নাখোশ ফ্রিডরিখ
সিইউপিএ বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জার্মানি মূলত ইইউর চালকের আসনে রয়েছে। রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় দেশগুলো ফ্রিডরিখের নেতৃত্বে একত্রিত হচ্ছে। জার্মানি ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ৩৭৮ বিলিয়ন ইউরো (৪৪৪ বিলিয়ন ডলার) অনুমোদন দিয়েছে। যা আগের চেয়ে ৬৭ বিলিয়ন ইউরো বেশি।

জার্মানির এই পুনরুত্থানের স্ফুলিঙ্গ কেবল মস্কোর বিপদ নয়, ওয়াশিংটনের প্রতিও বিরূপ মনোভাব নির্দেশ করে। মধ্য-ডানপন্থি দৃঢ়চেতা নেতা ফ্রিডরিখ মার্কিনপন্থি হলেও ইউক্রেন প্রশ্নে ইউরোপের নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি ওয়াশিংটনের প্রতি নাখোশ।

এক জরিপে বলা হচ্ছে, নেতৃত্বের দিক দিয়ে জার্মান চ্যান্সেলর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতাদের চেয়ে শক্তি দেখাচ্ছেন। বর্তমানে ক্রমবর্ধমান ঋণে জর্জরিত ফ্রান্স। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁকে এই সংকট নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধাগ্রস্ত করছে।

অপরদিকে নেতৃত্ব সংকট ও অভিবাসন সমস্যা যুক্তরাজ্যের কিয়ার স্টারমারকে দুর্বল করে দিয়েছে। উভয় দেশই ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে অস্পষ্ট নীতি নিয়েছেন। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ঋণের পরিমাণ তাদের জিডিপির ১০০ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে জার্মানির ঋণের পরিমাণ জিডিপির মাত্র ৬৩ শতাংশ।

তাছাড়া ২০২০ সালে ব্রেক্সিট কার্যকর হওয়ার পর ইইউ-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। গত বছর কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

দায়িত্ব গ্রহণের পর ফ্রিডরিখ সামরিক ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন, যাতে ন্যাটোর মূল প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৩.৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যায়। জার্মান সশস্ত্র বাহিনীকে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নেন তিনি।

চলতি ডিসেম্বরে সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বাড়ানোর জন্য আইন পাস করে জার্মানি। ২০২৬ সাল থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে যুদ্ধের জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলা।

ন্যাটো শক্তিশালী করা ও ইউক্রেনকে রক্ষার লক্ষ্য
চলতি বছরের মে মাসে চ্যান্সেলর নির্বাচিত হয়েই প্রথম বক্তৃতায় ফ্রিডরিখ বুন্দেসওয়েহরকে (জার্মান সশস্ত্র বাহিনী) ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জার্মানিকে বিশ্ব মঞ্চে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যাপক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ও নতুন অভিবাসন নীতি ঘোষণা করেন।

এরই মধ্যে ট্রাম্প দোষারোপ করেন, ন্যাটোর কিছু দেশ ইউরোপের প্রতিরক্ষা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নিজেরা অংশ নেয় না। এসব দেশকে ন্যাটো পরিত্যাগ করারও পরামর্শন দেন তিনি। এই অবস্থায় ফ্রিডরিখ ঘোষণা করেন, বার্লিন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াবে। ন্যাটোর অংশীদাররাও এটা প্রত্যাশা করে। আমাদের লক্ষ্য হল একটি শক্তিশালী ইউরোপ গঠন। ন্যাটো ও ইইউতে জার্মানি অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে চায়।

ফিড্ররিখ ওই বক্তব্যে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, রাশিয়া ইউক্রেনের কিছু অংশ দখল করে সন্তুষ্ট হবে না। এই যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না। এর মাধ্যমে হয় স্বৈরাচার ও সামরিক সহিংসতার শেষ হবে, অথবা আইন ও ন্যায়বিচারের বিজয় হবে। ইউক্রেনে ঝুঁকিতে মানে সমগ্র ইউরোপ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালাইসিস, এপি ও ডিডব্লিউ

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম