শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

তেল, প্রতিরক্ষা, ভূরাজনীতি: কেন ভারত সফর করছেন পুতিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৪৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

তেল, প্রতিরক্ষা, ভূরাজনীতি: কেন ভারত সফর করছেন পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দুইদিনের সফরে বৃহস্পতিবার ভারত যাচ্ছেন। সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি উভয় দেশের আয়োজিত বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেবেন।

দিল্লি ও মস্কোর মধ্যে এই সফরে বেশ কিছু চুক্তি সই হওয়ার কথা আছে। সফরটি এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে বাড়তি চাপ দিয়েছিল। ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ করতে রুশ প্রশাসনের সঙ্গেও আলোচনা চালাচ্ছেন মার্কিন প্রতিনিধিরা।

ভারত ও রাশিয়া বহু দশক ধরে ঘনিষ্ঠ মিত্র। পুতিন ও মোদির মধ্যেও সম্পর্ক বেশ উষ্ণ। কেন তাদের একে অপরের প্রয়োজন এবং এই সফরের কোন দিকগুলোর দিকে নজর রাখা উচিত তা এখানে তুলে ধরা হলো।

বিশেষ বন্ধুত্ব, বাণিজ্য চুক্তি, ভূরাজনীতি
শুরুতেই দেখা যাক ক্রেমলিনের কাছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেন গুরুত্বপূর্ণ। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই এর উত্তর পাওয়া যায়। প্রায় দেড় বিলিয়ন জনসংখ্যা, ৮ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ। এগুলো ভারতের বাজারকে রাশিয়ার পণ্য ও সম্পদের- বিশেষত তেলের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের তৃতীয় বৃহত্তম ভোক্তা হলো ভারত। তারা রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে। তবে এ চিত্র সবসময় এমন ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২.৫ শতাংশ ছিল রাশিয়ার তেল। সেটি এখন বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কারণ ভারতকে রাশিয়া বড় ধরনের মূল্য ছাড়ের সুযোগ দিয়েছে। মূলত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ইউরোপীয় বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকারের অবস্থা কাটিয়ে উঠতেই রাশিয়া এমন উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু এতে নয়াদিল্লি খুশি হলেও নাখোশ হয় ওয়াশিংটন।

গত অক্টোবরে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। তাদের যুক্তি ছিল, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনার মাধ্যমে ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিলে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। এরপর থেকে রাশিয়ান তেলের জন্য ভারতের অর্ডার কমে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের বিষয়টি পুতিনের সফরে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে পারে।

নয়াদিল্লির কাছে অস্ত্র বিক্রিও মস্কোর জন্য আরেকটি বড় অগ্রাধিকার। এই বাণিজ্য সোভিয়েত আমল থেকে চলে আসছে। পুতিনের সফরকে সামনে রেখে এমন খবরও এসেছে যে, ভারত সর্বাধুনিক রাশিয়ান যুদ্ধবিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পরিকল্পনা করছে। শ্রমিক সংকটে ভুগতে থাকা রাশিয়া ভারতের দক্ষ কর্মীদেরও মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখছে। কিন্তু এখানে ভূরাজনৈতিক হিসাব আছে।

ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। ক্রেমলিনের লক্ষ্য সেটিকে ব্যর্থ প্রমাণ করা। পুতিনের ভারত সফর সেটি প্রমাণ করার একটি উপায়। তিন মাস আগে একটি সম্মেলনে যোগ দিতে চীনে গিয়েছিলেন পুতিন। সেখানে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ছিলেন নরেন্দ্র মোদিও। তাদের একসঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ছবি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল- ইউক্রেনে যুদ্ধ চললেও মস্কোর এমন শক্তিশালী মিত্র আছে যারা বিশ্ব ব্যবস্থা বহু মেরুকরণের ধারণা সমর্থন করে।

রাশিয়ার নোভায়া গেজেটা পত্রিকার কলামিস্ট আন্দ্রে কোলেসনিকভ বলছেন, ‘আমি মনে করি ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো ক্রেমলিনকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা বিচ্ছিন্ন নই। কারণ এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে আমাদের সংযোগ আছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলে- এটাই ভবিষ্যত।’

আন্দ্রে কোলেসনিকভ আরও বলেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো রাশিয়া আবারও বিশ্বের এই অংশগুলোর প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে ফিরে এসেছে। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিল। তবে সেটি ছিল বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি।’

দার্শনিকরা প্রায়ই বলেন রাশিয়া ইউরোপের অংশ। আন্দ্রে কোলেসনিকভ বলছেন, ‘এখন আমরা তা আর নই। আমরা ইউরোপ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। এটি একটি বড় ব্যর্থতা। আমি নিশ্চিত যে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণির একটি অংশ আবার ইউরোপে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তারা শুধু চীন ও ভারতের সঙ্গে নয়, ইউরোপের সঙ্গেও ব্যবসা করতে চায়।’

তবে চলতি সপ্তাহটা হতে যাচ্ছে রাশিয়া-ভারত কেন্দ্রিক। দুই দেশের বন্ধুত্ব, বাণিজ্য চুক্তি এবং মস্কো ও দিল্লির মধ্যে বাড়তি অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে বেশি আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মোদির জন্য পরীক্ষা
ভ্লাদিমির পুতিনের দিল্লি সফরটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হচ্ছে, যখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক, বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও অটুট আছে। রাশিয়ার অন্য নেতাদের তুলনায় পুতিন এই সম্পর্কের পেছনে বেশি সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করেছেন।

তীব্র চাপ তৈরি করে পশ্চিমা দেশগুলো চেয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারত প্রকাশ্যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিক। এমন পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি বারবার বলেছেন, এই সংঘাত সমাধানের একমাত্র পথ হলো সংলাপ। এটাই ভারতের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। যেখানে মোদি এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে আছেন, যা তাঁকে একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক ধরে রাখতে সক্ষম করেছে।

তবে এই কৌশল ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। সম্প্রতি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সর্বকালের নিম্নস্তরে পৌঁছেছে। কারণ দুই দেশই শুল্ক সংক্রান্ত অচলাবস্থা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, পুতিনের সফর মোদির কাছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের পরীক্ষা নেবে। কূটনৈতিক প্রবাদ অনুযায়ী, মোদি এবার একটি দড়ির ওপর হাঁটতে যাচ্ছেন। যেখানে সামান্য ভুল হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি ভারতের জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলে দেখাতে চাইবেন, তিনি এখনও পুতিনকে নিজের মিত্র মনে করেন এবং ট্রাম্পের চাপের কাছে মাথা নত করেননি। কিন্তু বিষয়টি জটিল করেছে ইউরোপীয় মিত্রদের দেওয়া চাপ। চলতি সপ্তাহেই জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতরা ভারতের একটি সংবাদপত্রে যৌথ নিবন্ধ লিখেছেন। যেখানে ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার অবস্থানের সমালোচনা করা হয়েছে। তাই এখন নরেন্দ্র মোদিকে নিশ্চিত করতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা ও ইউরোপকে সহযোগিতার ওপর রাশিয়া সঙ্গে সম্পর্ক কোনো প্রভাব ফেলবে না।

দিল্লিভিত্তিক থিংক-ট্যাঙ্ক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (জিটিআরআই) বলছে, ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা, পাশাপাশি ওয়াশিংটনের চাপ এবং মস্কোর ওপর নির্ভরশীলতা মোকাবিলা করা।

নরেন্দ্র মোদির আরেকটি অগ্রাধিকার হবে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা উন্মোচন করা। বিশ্লেষকরা প্রায়ই বলেন, দুই শক্তিশালী মিত্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে প্রত্যাশার চেয়ে কম কার্যকর হয়েছে।

চলতি বছরের মার্চে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২০ সালে এটি ছিল মাত্র ৮.১ বিলিয়ন ডলার। ছাড়ের সুবিধার তেল কেনাটাই এমন বৃদ্ধির কারণ। কিন্তু এতে রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যেটির মধ্যে ভারসাম্য আনতে মোদি চাইবেন ভারতীয় পণ্যও রাশিয়ার বাজারে প্রবেশ করুক।

গত মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের সময় রাশিয়ার অস্ত্রের ভূমিকা প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। ভারত উন্নত এস-৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং এসইউ-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কিনতে চায়। কারণ পাকিস্তান এরই মধ্যে চীনের তৈরি জে-৩৫ পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার জেট কিনেছে। রাশিয়ার কাছে থেকে ভারতের একই সক্ষমতার জেট পাওয়ার অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞা ও ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে মস্কো সংকটময় পরিস্থিতিতে আছে। এরই মধ্যে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহের সময়সীমা ২০২৬ পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। এই সফরে মোদি পুতিনের কাছে সময়সীমা সংক্রান্ত নিশ্চয়তা চাইতে পারেন।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম