আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৬২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
মার্কিন প্রশাসন এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী ভূ-রাজনীতিতে জড়িত। এগুলোর লক্ষ্যও নৈতিকতার দিক থেকে পরস্পর বিরোধী বলে মনে করা হচ্ছে। একদিকে ইউরোপে যুদ্ধ থামাতে ইউক্রেনের ওপর একটি ‘শান্তি পরিকল্পনা’ চাপিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ ও পরোক্ষভাবে সরকার উৎখাতের হুমকি দিচ্ছে।
শান্তি স্থাপন ও আগ্রাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিপরীতমুখী অবস্থান এক ধরনের ‘রিয়েলপলিটিক’কে সামনে আনছে। ‘রিয়েলপলিটিক’ বলতে প্রতিপক্ষের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন কৌশল প্রয়োগের পররাষ্ট্রনীতিকে বোঝায়। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি (সিআইআরআইএস) বলছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রিয়েলপলিটিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি রাজনীতির এমন এক পদ্ধতি যেখানে আদর্শ বা নৈতিকতার তুলনায় ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যে ধারণার উৎপত্তি জার্মানিতে।
ইউক্রেন ও ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিও এই রিয়েলপলিটিকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। রুশ আগ্রাসনকে যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে সামলোচনা করে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজ দেশের গোয়েন্দা সংস্থাকে মারণাস্ত্র নিয়ে ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালানোর অনুমতি দিয়েছে। এখানে অভিযানের নাম শুধু বদলে গেছে। রাশিয়া তাদের আগ্রাসনকে ‘বিশেষ অভিযান’ বলছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপের নাম দিয়েছে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’।
প্রশ্ন হলো, ভিন্ন দুই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা কিংবা বহিরাগত হস্তক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ কী? সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? মার্কিন নাগরিকরা এমন নীতিকে কীভাবে দেখছেন? ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়ে রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইনে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার আগে প্রেক্ষাপটগুলো দেখা যাক।
‘তথাকথিত শান্তি পরিকল্পনা’
ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় শুরুতে ২৮টি দফা ছিল। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা যৌথ বিবৃতিতে জানান, এই রূপরেখা হালনাগাদ করা হয়েছে।
দফাগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যেসব বিষয় আছে সেগুলো হলো- ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা, ন্যাটোতে যোগ না দেওয়া, সামরিক বাহিনী ছোট করা ও মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মধ্যে বলা আছে, এটি নিশ্চিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ পাবে। আগ্রাসন নিরসন সংক্রান্ত চুক্তি হওয়ার পরও রাশিয়া যদি ইউক্রেনে হামলা করে, তাহলে তাদের ওপর সব ধরনের বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ যেখানে
শান্তি পরিকল্পনার ১৪ নম্বর দফায় এর একটি ইঙ্গিত আছে। বলা হয়েছে, ইউরোপে ফ্রিজ হওয়া রাশিয়ার ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ইউক্রেনে পুনর্গঠন ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগে বিনিয়োগ করা হবে। লাভের ৫০ শতাংশ পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাইরের দেশগুলোতে ৩০০-৩৫০ বিলিয়ন ডলারের মতো অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা পশ্চিমা দেশগুলোতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর অংশ হিসেবে ২৫০ বিলিয়ন ডলার ফ্রিজ হয়ে যায়। বড় একটি অংশ আছে বেলজিয়ামে।
বিবিসি জানিয়েছে, শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০ বিলিয়ন ডলার বাদে বাকি অর্থ যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার যৌথ বিনিয়োগ খাতে খরচ হবে। এর মাধ্যমে রাশিয়া কিছু অর্থ ফেরত পাবে। আবার যুক্তরাষ্ট্রেরও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।
তবে এখানে একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া এরই মধ্যে সম্পদ ফ্রিজ করার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ফলে বেলজিয়াম অর্থ ছাড়ের আগে আইনগত নিশ্চয়তা দাবি করেছে। ঝুঁকি এড়াতে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর কাছে থেকে দায়মুক্তিও চেয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় ‘আগ্রাসন’ ও কারণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত বলে দাবি করলেও, নিজেই যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় খুলেছেন। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন নামকরণ হয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’। এর প্রায় এক মাসের মাথায় ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তাদের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ভেনেজুয়েলায় মারণাস্ত্র নিয়ে অভিযান চালাবে।
চলতি মাসে দেশটি তাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ক্যারিবীয় সাগরে মোতায়েন করেছে। মাদক বহনকারী সন্দেহে চালানো মার্কিন বাহিনীর হামলায় ক্যারিবীয় সাগরে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত ৮৩ জন মারা গেছেন। কারাকাস (ভেনেজুয়েলার রাজধানী) মনে করছে, মাদক বিরোধী অভিযানের কথা বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানো। ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েক কর্মকর্তাও ব্যক্তিগতভাবে এ কথা স্বীকার করেছেন।
এ নিয়ে বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন: ‘ওয়ান্টেড’ মাদুরোর দেশে সিআইএ’র অভিযান, কী চায় যুক্তরাষ্ট্র
মাদুরো ও তাঁর প্রয়াত পূর্বসরী হুগো চাভেজ উভয়ের নীতিই মার্কিন আগ্রাসন বিরোধী। দ্য কনভারসেশনের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মাদুরোর প্রতি বিদ্বেষ ও তাঁর বিরোধীদের প্রতি মার্কিন সমর্থনের এটি একটি কারণ। এ ছাড়া, ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার অস্ত্রের অন্যতম ক্রেতা। সেটিও কারণ হতে পারে।
চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস ইকোনমিক থিংক ট্যাঙ্কের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ওয়াং ওমিং বলছেন, মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পেছনে তেল কেন্দ্রিক উদ্দেশ্যও আছে। ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের অন্যতম তেল মজুতকারী দেশ। কিন্তু মাদুরো ও তাঁর পূর্বসূরী হুগো চাভেজের জাতীয়করণ নীতির কারণে মার্কিন কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরন দেশটিতে তেমন সুবিধা করতে পারছে না।
‘আগ্রাসন’ নিয়ে আইন কী বলে
ভেনেজুয়েলা থেকে মাদকবাহী নৌকা সন্দেহে হামলার ঘটনাকে জাতিসংঘ এরইমধ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২ (৪) অনুযায়ী, অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ বা হুমকি নিষিদ্ধ। অনুচ্ছেদ ৫১-তে আছে আত্মরক্ষার অধিকারের কথা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৮(বি) অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিক, স্থাপনায় হামলা করাটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া, জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের প্রতিবেদনে ‘টার্গেট কিলিং’কে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র এই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়।
সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু
ইউক্রেনে যুদ্ধ বন্ধ: ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে কিয়েভকে শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে বলেছেন। কিন্তু এই খসড়া পরিকল্পনা নিয়ে কিয়েভ ও তাদের মিত্রদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। এই উদ্বেগ মূলত, রাশিয়ার কাছে লুহানস্ক, দোনেৎস্ক ও ক্রিমিয়ার মতো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়কেন্দ্রিক।
গত রোববার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্টমন্ত্রী মার্কো রুবির সঙ্গে বৈঠকে বসেন ইউক্রেন ও ইউরোপের প্রতিনিধিরা। ওই বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সম্ভাব্য চুক্তিতে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিনিধিরা বলেন, মার্কিন খসড়া পরিকল্পনার নতুন সংস্করণে তাদের বেশিরভাগ মূল অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়েছে।
মঙ্গলবার বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধিত খসড়া মস্কোর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে যুদ্ধ থামানো নিয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের তৎপড়তা আগের চেষ্টাগুলোর মতোই ভেস্তে যেতে পারে।
কারণ হিসেবে গণমাধ্যমটি বলছে, ডনবাস অঞ্চল নিয়ে এখনো মীমাংসা হয়নি। অঞ্চলটি থেকে ইউক্রেনকে সেনা সরিয়ে নিতে রাশিয়া বারবার চাপ দিয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে সমাধান না করে বরং বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেলেনস্কির পরবর্তী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তোলার অপেক্ষায় রাখা হয়েছে। ফলে, রাশিয়ার সামনে দুটি পথ- হয় খসড়া পরিকল্পনাকে আরও পাল্টানোর চেষ্টা, নয়তো সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করা।
আরও পড়ুন: যুদ্ধ বন্ধের জন্য পুতিন কেন ডনবাস চাইছেন
ভেনেজুয়েলায় সরকার বদল: লাতিন আমেরিকার দেশটি অভিযান চালানো নিয়ে খোদ নিজ নাগরিকদের সমর্থন পাচ্ছে না ট্রাম্প প্রশাসন। সম্প্রতি সিবিসি নিউজ ও ইউগভ এর জরিপে দেখা গেছে, বেশিরভাগ আমেরিকান ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের বিরোধী। ৭৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, এ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অবস্থান স্পষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।
একইভাবে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পক্ষগুলোও মাদুরোকে উৎখাতের জন্য তেমন যথেষ্ট নয়। দ্য কনভারসেশনের গত ৩১ অক্টোবরের নিবন্ধে বলা হয়েছে, দেশটিতে বিরোধীপক্ষগুলো ক্রমেই দুর্বল ও বিভক্ত হয়ে গেছে। বিরোধী নেত্রী মারিয়া করোনা মাচাদো শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর সমর্থকদের মনোবল কিছুটা বাড়লেও সেটি এখনও কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারেনি।
ওই নিবন্ধে বোশ একাডেমির রিকার্ড ভন ভেইৎজেকার ফেলো রবার্ট মুগা বলেছেন, বিরোধীদের পক্ষে মাদুরোকে জোরপূর্বক সরানোর সম্ভাবনা কম। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বিভাজন ও বড় আকারে মার্কিন হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।