শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

‘নো কিংস’ কী, যুক্তরাষ্ট্রে কেন ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   সোমবার, ২০ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৯৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

‘নো কিংস’ কী, যুক্তরাষ্ট্রে কেন ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ

‘থাকবে না কোনও সিংহাসন, মুকুট কিংবা রাজা। ক্ষমতা কেবলই জনগণের।’ যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল শনিবারের এক বিক্ষোভ সমাবেশে এমন স্লোগান দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যে দেশের সরকারপ্রধান ও রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্র ফেরি করেন তাদের দেশে হঠাৎ গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন কেন?

নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, ফ্লোরিডা, ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গতকাল ‘নো কিংস’ ব্যানারে যে সমাবেশ হয় সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদত্যাগের দাবি ওঠে। অংশগ্রহণকারীরা সমস্বরে স্লোগান দেন ‘হে হে… হো হো… ডোনাল্ড ট্রাম্প মাস্ট গো’। আয়োজকরা জানিয়েছেন, ৫০টি অঙ্গরাজ্যে বিক্ষোভে অংশ নেন ৭০ লাখের বেশি মানুষ। পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার জন্য আগামী ২১ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদত্যাগ দাবি করছেন? পক্ষে-বিপক্ষে কী বলা হচ্ছে? ‘নো কিংস’ কর্মসূচি কী, কারা এর আয়োজক। আন্দোলনে গতি সঞ্চারের জন্য আয়োজকরা ‘সাড়ে ৩ শতাংশ’ নীতির কথা বলছেন, সেটিই বা কী।

ক্ষোভ থেকে ‘নো কিংস’
দুই’শর বেশি সংগঠনের একটি জোট বা প্ল্যাটফর্ম হলো ‘নো কিংস’। যেটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও আচরণের বিরুদ্ধে গণপ্রতিবাদ গড়ে তুলেছে। ট্রাম্পের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনকে’ আন্দোলনকারীরা রাজার শাসনের সঙ্গে তুলনা করছেন। বলছেন, জনগণের করের অর্থে ট্রাম্প অযাচিত প্রভাব প্রতিষ্ঠায় মত্ত। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

ট্রাম্পের বেশ কিছু বিতর্কিত নীতি, যেমন অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান, শহরগুলোতে সেনা মোতায়েন এবং রাজনৈতিক সমালোচকদের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থানকে মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা। এই জোটের সদস্যদের মধ্যে আছে প্রগতিশীল সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, শিক্ষক ও নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী।

‘নো কিংস’র ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, জোটের আয়োজনে প্রথম বড় জমায়েত হয় গত জুনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিনে। দিনটিকে তারা ‘নো কিংস ডে’ হিসেবে ঘোষণা দেন। দ্বিতীয় বৃহৎ আন্দোলনটি হলো গতকাল শনিবার। জোটের কর্মসূচি পালনের একটি সাধারণ ধরন আছে। যেমন- পতাকা বহনের পাশাপাশি হলুদ রঙের পোশাক পরা। এটিকে বলা হচ্ছে অহিংস প্রতিরোধ ও ঐক্যের প্রতীক। আর পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করার জন্য চলে নাচ, গান।

কেন আন্দোলন, লক্ষ্য কী
নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, এএফপি ও এনপিআরের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা ট্রাম্পের কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধরনকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এ জন্য পরিবর্তন চাইছেন।

আন্দোলনের মূল স্লোগান হলো ‘নো কিংস, অনলি পিপল’। এ ছাড়া, ‘নো ডিক্টেটর, নো কিংস’ স্লোগানও দেওয়া হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, ট্রাম্প অনেকটা রাজাদের ধাঁচে শাসন চালাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হস্তক্ষেপ করছেন। কঠোর অভিবাসন নীতির পাশাপাশি সেনা মোতায়েন করছেন গুরুত্বপূর্ণ শহরে। সবশেষ শাটডাউন বা বেশ কিছু সরকারি দপ্তরে অচলাবস্থা তৈরির ঘটনাও মানুষের মাঝে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এ জন্য তারা রাস্তায় নেমেছেন।

নিজেদের ওয়েবসাইটে আন্দোলনকারীরা লিখেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের মুখোশধারী এজেন্ট বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। তারা অভিবাসী পরিবারগুলোকে টার্গেট করছে। পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার ও আটক করছে। স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সুরক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটিতে বন্দুকধারীদের গুলির ঘটনা উপেক্ষা করছে। কিছু পরিবার যখন টিকে থাকার লড়াই করছে, তখন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ধনকুবের মিত্রদের বিশাল সুবিধা দিচ্ছেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট মনে করেন, তাঁর শাসনই চূড়ান্ত। কিন্তু আমেরিকায় কোনও রাজার শাসন চলবে না।

পক্ষে-বিপক্ষে ও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
শনিবারের আন্দোলন নিয়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে গত জুনে আন্দোলনের সময় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন।

ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি নিজেকে কখনও রাজা মনে করি না। এমন পরিবেশও নেই। কারণ, কোনও প্রস্তাব অনুমোদন করাতে আমাকে নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

গতকালের বিক্ষোভ নিয়ে ট্রাম্পের কোনও বক্তব্য আছে কি না তা জানতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসনের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করেছিল নিউ ইয়র্ক টাইমস। জবাবে জ্যাকসন লিখেন, ‘হু কেয়ারস (কে পরোয়া করে)’।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা এই কর্মসূচিকে ‘আমেরিকা বিরোধী’ হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে। তবে উদারপন্থী ও প্রগতিশীল শিবির এই আন্দোলনকে আমেরিকান গণতন্ত্র রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।

‘সাড়ে ৩ শতাংশ’ নীতি ও পরিণতি
আন্দোলনকারীরা প্রায়ই সাড়ে তিন শতাংশ নীতির কথা উল্লেখ করছেন। এ নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়েছে, কোনও দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত সাড়ে তিন শতাংশ মানুষ যদি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিবাদে অংশ নেয়, তাহলে সেই শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ হয়। এই ধারণাটিই ‘সাড়ে ৩ শতাংশ নীতি’ নামে পরিচিত।

রাজনীতি বিশ্লেষক এরিকা চেনোয়েথ ও মারিয়া স্টিফেন ১৯০০ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত নাগরিক আন্দোলনের একটি ডাটাবেস তৈরি করেছেন। অহিংস বা সহিংস আন্দোলনের মধ্যে কোনটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং আন্দোলনে অংশগ্রহণের পরিমাণ কত হলে ক্ষমতাসীন দল বা নেতাকে অপসারণ করা সম্ভব হয়- সেটি খুঁজে বের করা ছিল তাদের গবেষণার উদ্দেশ্য।

ফলাফলে দেখা গেছে, সহিংসতার চেয়ে অহিংস আন্দোলন সাধারণত আকারে বড় হয়। এ কারণে অহিংস আন্দোলনের সফল হওয়ার সম্ভাবনা দুই গুণ বেশি। এসব আন্দোলন জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। গবেষকরা আরও দেখেন, কোনও দেশের অন্তত সাড়ে তিন শতাংশ মানুষ যদি সক্রিয় ও ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়, তাহলে সেই আন্দোলন প্রায় নিশ্চিতভাবে সফল হয়, দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া।

যুক্তরাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের গণতন্ত্র সূচক (২০২৪) অনুযায়ী, ৯.৮১ স্কোর নিয়ে শীর্ষে আছে নরওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রথম ১০টি দেশের তালিকায় নেই। ৭.৮৫ স্কোর নিয়ে অবস্থান ২৭তম।

গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডয়চে ভেলে। তাতে বলা হয়, মাত্র ১০ শতাংশ মার্কিনি মনে করেন গণতন্ত্র ঠিকভাবে চলছে (২০২৩ সালের একটি জরিপ)। অর্থ্যাৎ, বড় সংখ্যক মানুষই মনে করেন গণতন্ত্র ঠিক নেই।

এ ছাড়া, দেশটির নির্বাচন ব্যবস্থায় ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি সঠিকভাবে ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের চেয়ে ২৯ লাখ ভোট বেশি পান হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতির কারণে হিলারি হেরে যান। অর্থ্যাৎ, গণতন্ত্রের মূলনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণের যে বিষয়ের কথা উল্লেখ আছে, মার্কিন গণতন্ত্র সেখানেই বড় গলদ জিইয়ে রেখেছে।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম