জাতীয় ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ১০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা নিরাপত্তা ছাড়পত্র ইস্যু করেনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ফলে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে ৭ এপ্রিল যে ফুয়েল লোড করার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। এতে দেশের প্রথম পারমাণবিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও পিছিয়ে গেল।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, সব কাজ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ। এটা পর্যালোচনা করতে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের হয়তো দুই থেকে চার দিন সময় লাগবে। এর পর ফুয়েল লোডিংয়ের তারিখ ঘোষণা করা হবে। আশা করছি, এপ্রিলেই ফুয়েল লোড সম্ভব হবে।
রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট মিলে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি নির্মাণ করছে রাশিয়ার সংস্থা রোসাটম।
প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালে ও দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৪ সালে উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। কয়েক দফা সময়সীমা পিছিয়ে ৭ এপ্রিল জ্বালানি লোড করার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে তা আটকে গেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, জ্বালানি লোড করার আগে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। প্রতিটি ধাপ শেষে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ইস্যু করে থাকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। জ্বালানি লোড করার আগে লাইসেন্স নিতে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রটির অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এরপরই আপত্তি তোলে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, লাইসেন্স নিতে রাশিয়ান ঠিকাদার এবং প্রকল্পের কর্মকর্তারা নানাভাবে তদবির চালান। আপাতত লাইসেন্স নিয়ে জ্বালানি লোড করার পর বাকি কাজ শেষ করবে– এমন আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে পরমাণু শক্তি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, শতভাগ নিরাপত্তা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া হবে না।
বিষয়টি নিয়ে মঙ্গলবার গভীর রাত পর্যন্ত সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক চলে। তবে শেষ পর্যন্ত সুরাহা না হওয়ায় জ্বালানি লোডের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেষ্টা করছি। সে জন্য প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হয় নিখুঁতভাবে। শেষ মুহূর্তে ছোটখাটো সমস্যা থাকার কারণে অল্প কয়েক দিনের জন্য জ্বালানি লোডিং শিফট হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য যেসব নথি দেওয়ার কথা ছিল, তা তারা জমা দিয়েছেন। বলা হয়েছিল, যদি কোনো ঘাটতি না থাকে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তাদের শর্তসাপেক্ষ লাইসেন্স দেবে। যেহেতু সংস্থাটি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, তাদের তরফে আরও কিছু পর্যবেক্ষণ এসেছে। সেগুলো পূরণ করতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, মূলত সমস্যা হয়েছে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও অগ্নি পরিমাপ-সংক্রান্ত বিষয়ে। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস বিভাগ আবারও পরবর্তী পর্যবেক্ষণে আসবে এবং অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন করবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগতে পারে। সে কারণে জ্বালানি লোডিংয়ের নির্ধারিত সময় পেছাতে পারে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, গত নভেম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। ফিজিক্যাল স্টার্টআপের প্রস্তুতির সামগ্রিক অবস্থা নিরীক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, রাশিয়ার শিল্প ও কর্মক্ষেত্র নিরাপত্তা তদারকি-সংক্রান্ত সংস্থা-ভিও সেফটি তিনটি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধি দল গত ৭ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ সময় ২৫৭টি পর্যবেক্ষণ চিহ্নিত করা হয়। এসব পর্যবেক্ষণের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে পুনর্পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত মূল্যায়নের জন্য বলা হয়েছে। আশা করছি, কয়েক দিনে এগুলো সম্পন্ন হবে এবং তাড়াতাড়ি জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স পেয়ে যাব।
এদিকে, জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধন ঘিরে ইতোমধ্যে রোসাটমের একটি টিম বাংলাদেশে এসেছে। রোসাটমের উচ্চ পর্যায়ের আরও কয়েকজন প্রতিনিধি আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এখন রোসাটমের প্রতিনিধি দল রাশিয়া ফিরে নতুন তারিখ ঘোষণার পর আবার আসবে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি লোডিং শেষ করতে প্রায় এক মাস সময় লাগে। এরপর পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু করতে আরও দুই মাস সময় প্রয়োজন হয়। সব মিলিয়ে জ্বালানি লোডিংয়ের পর পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে ১০ থেকে ১১ মাস লাগে।
ঢাবির নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো শফিকুল ইসলাম বলেন, ছয় বছরের প্রকল্প ৯ বছরেও শেষ না হওয়ার ক্ষতি অপূরণীয়। বিলম্বের কারণে বিদ্যুৎ না পেয়েও প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা সুদ গুনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।