জাতীয় ডেস্ক | রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ১১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
আজ ২২ মার্চ। ১৯৭১ সালের এ দিনও গোটা দেশে পুরোদমে চলেছে প্রতিরোধের প্রস্তুতি। সে প্রস্তুতি ছিল স্বাধীনতার জন্য বাঙালির চূড়ান্ত সংগ্রামের।
প্রতিদিনের মতো এ দিনও শোভাযাত্রা-মিছিল-সমাবেশে উত্তাল ছিল রাজধানী ঢাকা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পথে পথে নামে অবিচ্ছিন্ন মিছিলের স্রোতধারা। এই স্রোত থেকে স্বাধীনতার দাবিতে উচ্চারিত শ্লোগান কাঁপিয়ে তোলে চারদিক। সব মিছিল গিয়ে থেমেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাড়ির সামনে।
মিছিলে সমবেত মুক্তি পাগল বাঙালির উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার রক্ত দিয়ে আমি আপনাদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করব।’ পরে বিদেশি এক টেলিভিশন সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের তিনিই হচ্ছেন প্রতিনিধি। তাই একমাত্র তারই শাসন করার অধিকার রয়েছে।
ঢাকার বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে শিশু-কিশোর এবং পল্টন ময়দানে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকদের সমাবেশ ও কুচকাওয়াজে মানুষের ঢল নামে। কুচকাওয়াজ শেষে পল্টন ময়দানে বাঙালি যোদ্ধাদের বিশাল সমাবেশে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এমআই মজিদের সভাপতিত্বে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এমএজি ওসমানীসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালনে সর্বাত্মক সংগ্রামের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে দেন তারা। একই সঙ্গে বিমান, নৌ ও স্থল বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের নিজ এলাকার আওয়ামী লীগ, সংগ্রাম পরিষদ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। জনতার মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি, হাততালি ও শ্লোগান মুক্তিসংগ্রামে বাঙালি সাবেক সৈনিকদের আনুষ্ঠানিক সমর্থনদানের এই ঘোষণাকে অভিনন্দিত করে। সমাবেশ শেষে সৈনিকরা কুচকাওয়াজ সহকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে সামরিক কায়দায় শহীদ বেদীতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সর্বাত্মক সফল করার শপথ নেন। পরে কুচকাওয়াজ করতে করতেই ধানমন্ডির বাসভবনে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করেন তারা।
এ দিন স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু করে। পরিষদের উদ্যোগে আগে থেকেই তৈরি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার প্রতিকৃতি। এ দিন সে রঙিন পতাকাই ঢাকার সমস্ত সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে ছাপা হয়। পরিষদ নেতারা বিবৃতিতে এ পতাকা ২৩ মার্চ তথাকথিত ‘পাকিস্তান দিবসে’ বাংলার ঘরে ঘরে উত্তোলনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগ এ দিন ঢাকার প্রতিটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ নামে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। এতে স্বাধীনতার দাবিতে অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও কামরুজ্জামানের লেখা নিবন্ধ ছাপা হয়।
বঙ্গবন্ধু তাঁর লিখিত বাণীতে বলেন, ‘…লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে- প্রতিরোধের দুর্গ। আমাদের দাবি ন্যায়সঙ্গত। তাই সাফল্য আমাদের সুনিশ্চিত। জয় বাংলা।’
এ দিনও প্রেসিডেন্ট হাউসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং বঙ্গবন্ধুর মধ্যে প্রায় সোয়া ঘণ্টা বৈঠক হয়েছে। বৈঠক শেষে ভুট্টো তড়িঘড়ি করে হোটেল কন্টিনেন্টালে আহুত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ভবনে শেখ মুজিব, ইয়াহিয়া ও আমার মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। শেখ মুজিবের সঙ্গে আমি আরও ফলপ্রসূ ও সন্তোষজনক আলোচনায় আগ্রহী। কারণ সমস্যা সমাধানে প্রথমে আমাকে ও শেখ মুজিবকে একমত হতে হবে।’
অন্যদিকে ইয়াহিয়া খান এ দিন সকালে ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রেসিডেন্ট হাউসের এক ঘোষণায় বলা হয়, ‘পাকিস্তানের উভয় অংশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণে সুযোগ সৃষ্টির জন্যই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’