খেলা ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৭৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ভারত ম্যাচের আগে থেকে শেষ পর্যন্ত সব আলো ছিল হামজা চৌধুরীর ওপর। তবে বাংলাদেশের ২২ বছরের অপেক্ষাটা ফুরিয়েছে শেখ মোরছালিনের অনিন্দ্য সুন্দর গোলে। মঙ্গলবার ভারত বধের পর ড্রেসিংরুমে উদযাপন করেছেন দলের সবাই। আর গোলদাতা মোরছালিনের জন্য রাতটা ছিল বিশেষ কিছু। ভাবতে ভাবতেই কেটে গেছে তাঁর। নির্ঘুম রাত কাটালেও এখনও ঘোর কাটেনি তাঁর। কল্পনার গোলটি বাস্তবে রূপান্তরিত হওয়াসহ নানান বিষয়ে শেখ মোরছালিন গতকাল বুধবার কথা বলেছেন সঙ্গে। তা শুনেছেন সাখাওয়াত হোসেন জয়।
২২ বছর পর ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়। রাতে কেমন উদযাপন করেছেন?
মোরছালিন: আমি তো সারারাত ঘুমাতে পারিনি। অন্য রকম এক ভালো লাগা কাজ করেছে। ড্রেসিংরুমে সবাই নেচে-গেয়ে উদযাপন করেছি। সেই উচ্ছ্বাসটি ছিল হোটেলেও। আসলে জয়টা ভারতের বিপক্ষে তো তাই উদযাপনটা একটু বেশিই করেছি আমরা।
আপনার গোলেই হয়েছে ভারত বধ। অনুভূতিটা কেমন লাগছে?
মোরছালিন: আমি খুবই খুশি। গোলটা আমার পক্ষে একা করা সম্ভব ছিল না। রাকিব ভাই সহযোগিতা করেছেন। টিমের সবাই সাপোর্ট করেছে। সবকিছু মিলিয়ে আমি সুখী একজন মানুষ।
গুরপ্রীতের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে গোল। গোলটি নিয়ে একটু বলেন।
মোরছালিন: গোলের পুরো কৃতিত্ব রাকিব ভাইয়ের। তিনি এত সুন্দর করে বলটা বানিয়ে দিয়েছেন, আমি শুধু টাচ করেছি। আমরা একসঙ্গে অনেক দিন ধরেই খেলছি। রাকিব ভাই এবং আমার সঙ্গে বোঝাপড়াটা দারুণ। আমি জানি তিনি কখন বল দেন।
আপনি কি কখনও ভেবেছেন নাটমেগে গোল করবেন?
মোরসালিন: আমি খেলার আগে ভাবছিলাম যে গোলরক্ষকের পা তো লম্বা এমনভাবে একটা গোল করা যায় কিনা? মানুষ তো, এমনিতেই ভাবি। আমিও এমনটা ভাবছিলাম। আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম যে ওর (গুরপ্রীত) পায়ের ফাঁক দিয়ে বল মারলে গোল হয়ে যাবে। কিন্তু মাঠে নামার পর এই বিষয়টা আমার আর মনে নেই। পরে গোল করার পর আমার মনে পড়েছে যে, আমি এমনটাই ভেবেছিলাম। বলতে পারেন কল্পনার গোলটি আমি বাস্তবে করেছি। আর আমার অনেক দিনের স্বপ্ন নাটমেগে গোল করব। ভারত ম্যাচে সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়াতে আমি অনেক খুশি। আর ভারতের বিপক্ষে গোল করার স্বপ্নটা আমার ছোটবেলা থেকেই। তাই আমার কাছে এই গোলটি স্বপ্নিল গোল।
ক্যারিয়ারে সাত গোলের মধ্যে কোনটাকে এগিয়ে রাখবেন?
মোরছালিন: অবশ্যই ভারতের বিপক্ষে করা গোলটাকেই এগিয়ে রাখব। সবগুলো গোলই আমার কাছে ভালো। ভারতের বিপক্ষে গোলের মাহাত্ম্যটা অন্যরকম। আমার গোলে ২২ বছর পর তাদের হারানো। এটা স্মরণীয় কিছু আমার জন্য। এতগুলো মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। ১৮ কোটি মানুষ আমাদের খেলা দেখেছেন, এটার বিকল্প কিছু হয় না।
সর্বশেষ যখন ভারতকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, তখন আপনার জন্ম হয়নি। আপনার গোলেই ফুরাল জয়ের অপেক্ষা।
মোরছালিন: ভারতের সঙ্গে খেলা মানেই বিশেষ কিছু। তারা আমাদের প্রতিবেশী দেশ। সব সময় দেখেছি, ক্রিকেট কিংবা অন্য কোনো খেলা হোক, তারা আমাদের ছোট করে দেখে। বলতে পারেন, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে একটা জেদ কাজ করছিল সব প্লেয়ারের মধ্যে। আমরা যখন ভারতে যাই, দেখা গেল আমাদের ছোট করে দেখা হয়। এই ব্যাপারগুলো আমাদের গায়ে লাগে। তাই ভারতের বিপক্ষে যখন খেলা হয়, তখন আমাদের আবেগটা কাজ করে বেশি। ভারতের বিপক্ষে এর আগে যখন জিতেছিল, তখন আমার জন্ম হয়নি। তবে ফুটবলার হওয়ার পর সেই ম্যাচের গল্প অনেক শুনেছি। নিজের মধ্যে একটা বিশ্বাস কাজ করছিল যদি সুযোগ আসে, ভারতের বিপক্ষে গোল করব। অবশেষে সেটা করতে পেরেছি।
ভারতকে হারানোর পর এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করতে না পারার আফসোস কাজ করছে কিনা?
মোরছালিন: একটু আফসোস তো থাকারই কথা। তার পরও আল্লাহ ভাগ্যে যেটা রেখেছেন, সেটা হয়েছে। হয়তো সামনে আরও ভালো কিছু হবে। তবে ভারতকে হারিয়েছি এটাও একটা প্রশান্তি।
হামজা আসার পরে, বিশেষ করে প্রবাসীরা আসার পরে দলের চেহারা কতটা বদলেছে?
মোরছালিন: ওরা (প্রবাসী) সবাই আসার পর আমরা এখন অনেক শক্তিশালী। টিম কম্বিনেশন থেকে শুরু করে সবকিছুই এখন অনেক ভালো। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও অনেক ভালো।
গোলের পর হামজা আপনাকে কী বলেছেন?
মোরছালিন: আমাদের তো সাত আর আট নম্বর জার্সি, তাই আমরা ড্রেসিংরুমে একসঙ্গেই বসি। জয়ের পর আমরা একে অপরকে আলিঙ্গন করেছি। গোলের পর আমার ওপর খুবই খুশি হয়েছেন হামজা ভাই। আমাকে গোল্ডেন বয় বলেছেন। টিমের মধ্যে হামজা ভাই আমাদের অনেক অনুপ্রেরণা দেন। আপনি তো খেলার মধ্যেই দেখছেন তিনি কতটা সিরিয়াস থাকেন। যেভাবে লিড দেন, সেটা আমাদের জন্য অনেক বড় বিষয়।
ইনজুরি থেকে ফিরে এসেই অসাধারণ গোল।
মোরছালিন: মাঝে চোটে ছিলাম। ইনজুরির কারণে নেপাল ম্যাচে খেলতে পারিনি। তারপর ভারত ম্যাচে ফিরেছি এবং গোল করেছি। সেই জন্য অনেক খুশি আমি।
মাঝে ব্যক্তিগত সমস্যা এবং পারফরম্যান্সও ভালো ছিল না আপনার। কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন?
মোরছালিন: আমি অনেক শক্ত মানসিকতার লোক। ছোটবেলা থেকেই যে কোনো বিষয়ে আমি শক্ত। হয়তো ফিজিক্যালি অনেকের কাছে আমি শক্তিশালী না। বাজে সময়ে পরিবার আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছে। সব বিষয়ে আমাকে পরিবার সাপোর্ট করে। আবারও বলছি, আমি মেন্টালি অনেক শক্তিশালী।
প্রবাসী-দেশি মিলিয়ে একটা ভালো দল হয়েছে। এই দল নিয়ে আপনার স্বপ্নটা কী?
মোরছালিন: আমরা মাঝেমধ্যে দেখি, বিভিন্ন মিডিয়ায় আসে প্রবাসী খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো না। আমরা নাকি তাদের সেভাবে সাপোর্ট করি না। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। আমরা কখনও ভাবি না তারা বাইরে থেকে এসেছেন। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। কিছু উল্টাপাল্টা নিউজ করার কারণে টিমের মধ্যে একটা নেগেটিভ ধারণার সৃষ্টি হয়। আমরা চাই নেতিবাচক কিছু যেন কেউ না করে। সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করি। আমরা সবাই বাংলাদেশি। সবাই মিলে আমরা ভবিষ্যতে ভালো কিছু অর্জন করতে চাই।