জাতীয় ডেস্ক | মঙ্গলবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৪৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
অবশেষে নিবন্ধিত দল জোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে ভোট করার বিধান রেখেই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে সরকার। সোমবার আইন মন্ত্রণালয় এ অধ্যাদেশের গেজেট জারি হয়েছে।২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন করে।
এরপর জোটের প্রতীকের সংশ্লিষ্ট ২০ অনুচ্ছেদ অনুচ্ছেদে সংশোধন নিয়ে বিএনপি আপত্তি তুললেও জামায়াত ও এনসিপি সংশোধন বহাল রাখার দাবি তোলে। অবশেষে জোট করলেও ভোট করতে হবে স্ব স্ব দলের প্রতীকে-এমন বিধান রেখেই অধ্যাদেশ জারি হলো। এর মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক নিবন্ধিত দল জোট করলেও জোট মনোনীতি প্রার্থী বড় দলের বা অন্য দলের প্রতীকে ভোট করতে পারবে না, নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে একগুচ্ছ সংশোধন আনা হয়েছে আরপিও তে।
আরপিও সংশোধন অধ্যোদেশ জারির মধ্যে নির্বাচনী আইনের সব ধরনের সংস্কার কাজ শেষ হলো। ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা আইন সংশোধন, নির্বাচন কর্মকর্তা বিশেষ বিধান আইন সংশোধন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন সংশোধন, ভোটকেন্দ্র নীতিমালা, দেশি-বিদেশি পয’বেক্ষণ নীতিমালা, সাংবাদিক নীতিমালাসহ সব ধরনের আইন-বিধি সংস্কার করেছে ইসি। আরপিও সংশোধন হওয়ায় এর আলোকে দ্রুত দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা জারি করবে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি।
আরও যত সংশোধন: ফেরারি হলে ভোটে বাদ
আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় এবারের ভোটে বেশ কিছু নতুন বিধান এসেছে।
আদালত ঘোষিত ফেরারি আসামি ভোট করতে পারবে না- এমন বিধান যুক্ত হলো এবার। দেড় দশক পর আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় যেমন সশস্ত্র বাহিনী যুক্ত হয়েছে, তেমনি ‘না’ ভোট ফিরছে একক প্রার্থীর আসনে। সমভোট পেলে হবে পুনভোট, জোটে ভোট করলেও নিজ দলের মার্কায় ভোট, জামানত ৫০ হাজার টাকা, দলীয় আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানা, আইটি সাপোর্টে পোস্টাল ভোটিং পদ্ধতি, অনিয়মে পুরো আসনের ভোট বাতিল, এআই এর অপব্যবহার করলে নির্বাচনী অপরাধ এবং হলফনামায় অসত্য তথ্য দিলে (ভোটে অযোগ্য এমন) নির্বাচিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা নিতে পারবে ইসি।
অনুচ্ছেদ-২: আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর মধ্যে সেনা বাহিনী, নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনী থাকছে। ২০০১ ও ২০০৮ সালের ভোটে এমন বিধান ছিল। এ সংজ্ঞা সংশোধন করায় তিনটি নির্বাচনের পর ফের তা ফিরে এলো।
অনুচ্ছেদ-৮: ভোটকেন্দ্র (পোলিং স্টেশন) প্রস্তুতের ক্ষেত্রে জেলা নির্বাচন অফিসারের হাতে রাখা হয়েছে। এ কর্মকর্তারা তালিকা করে কমিশনের অনুমোদন নেবে।
অনুচ্ছেদ ৯: রিটার্নিং অফিসার কোনো ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করলে ইসিকে অবহিত করবেন।
অনুচ্ছেদ ১২: কোনো আদালত কর্তৃক ফেরারি বা পলাতক আসামি ঘোষিত হলে সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য হবে। সেক্ষেত্রে পলাতক আসমি প্রার্থী হতে পারবেন না।
সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বা অন্য কোনো পদে অধিষ্ঠিত থাকলে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন।
কোনো প্রতিষ্ঠানের কাযনির্বাহী পদকে ‘লাভজনক’ পদের সংজ্ঞাভূক্ত করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কাযনির্বাহী পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন না।
হলফনামায় দেশে-বিদেশে আয়ের উৎস এবং সবশেষ বছরের রিটার্ন জমা দিতে হবে।
প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য সংক্রান্ত হলনামায় অসত্য তথ্যের প্রমাণ পেলে ভোটের পরেও ইসির ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ১৩: প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্রের সাথে দেওয়া জামানতের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আগে ২০ হাজার টাকা জামানত ছিল।
অনুচ্ছেদ-১৪: রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশে ক্ষুব্ধ হলে প্রার্থী বা ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা কোনো সরকারি সেবাদানকরী প্রতিষ্ঠানও আপিল করার সুযোগ পাবেন।
অনুচ্ছেদ-১৯: এ ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কোনো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী যদি একজন থাকে, তাহলে ব্যালট পেপারে ‘না’ ভোটের বিধান থাকবে। তবে দ্বিতীয়বার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ‘না’ ভোট থাকবে না।
অনুচ্ছেদ- ২০: নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জোটগতভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ-২১: নির্বাচনী এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেঅনত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার হতে হবে।
অনুচ্ছেদ- ২৫: এ প্রিজাইডিং অফিসারের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ২৬ : নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ‘ইভিএমে ভোট দেওয়ার বিধান বিলুপ্ত’। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত বিধানগুলো বিলোপ করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ-২৭: পোস্টাল ভোটিং এর বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। প্রবাসী, সরকারি চাকরিজীবি ও দেশের ভেতরে আটক ভোটারদের পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট পদ্ধতির বিধান এবার যুক্ত হলো।
এর মাধ্যমে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং এ আর বাধা থাকল না।
অনুচ্ছেদ ২৯: পরিমার্জন করে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের তালিকায় গণমাধ্যমকর্মীদের থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৬: ভোট গণনার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিত থাকার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৭: ভোটের দিন প্রিজাইডিং অফিসারের বাতিল করা সব ভোটকেন্দ্রের ভোট পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, বিধায় বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে ‘তিনি প্রয়োজন মনে করলে গণনা করতে পারবেন’ বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৩৮: সমভোট পেলে লটারির পরিবর্তে পুনভোট হবে। আগে সমভোট প্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্যে লটারি করে একজনকে নির্বাচিত করার বিধান ছিল।
অনুচ্ছেদ ৪৪: এ অনুচ্ছেদে বেশ কিছু নতুন সংযোজন এসেছে। প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় ভোটার প্রতি ১০ টাকা হার নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলকে যুক্ত করে পরিমার্জন করা হয়েছে। অনুদান হিসেবে পাওয়া অর্থের তালিকা বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট করে ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নির্বাচন কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শকের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৭৩- এ মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, গুজব ও এআই অপব্যবহার রোধে প্রার্থী ও দলের বিষয়ে অপরাধের বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৭৪, ৮১, ৮৭, ৮৯-এ ছোটোখাটো পরিমার্জন আনা হয়েছে।
দল নিবন্ধন ও আর্থিক অনুদানের বিষয় এবং নিবন্ধন স্থগিত হলে প্রতীক স্থগিত করার বিধান রয়েছে অনুচ্ছেদ ৯০-এ।
অনুচ্ছেদ ৯১: অনিয়মের জন্য কেন্দ্রের ভোট বাতিলের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে পুরো নির্বাচনী এলাকার ফল বাতিলের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইসিকে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের দণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। দলের ক্ষেত্রেও জরিমানার বিধান রয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে নির্বাহী ও বিচারিক হাকিমের পাশাপাশি ইসির ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিধান রয়েছে।
এ অনুচ্ছেদের হলফনামার অসত্য তথ্য দেওয়ার বিষয়ে ইসি যাচাই দেখা ও ভোটের পরেও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখা হয়েছে ইসির।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন যেসব বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে তা উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন করে।
দলগুলোর দাবির মধ্যেও এরপর আর কোনো পরিবর্তন আসেনি।
উপদেষ্টা পরিষদের নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির সই হলে সোমবার তা সংশোধন অধ্যাদেশ আকারে জারি হয়েছে।