শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

প্রধান উপদেষ্টা আশাবাদী ভিন্নমতে অনড় দলগুলো

জাতীয় ডেস্ক   |   বৃহস্পতিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৪৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

প্রধান উপদেষ্টা আশাবাদী ভিন্নমতে অনড় দলগুলো

জুলাই সনদ নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘অতি জরুরি’ বৈঠক করলেও রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। গতকাল বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠকে বিএনপি জানায়, তাদের নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) থাকলে সনদে সই করবে। জামায়াতে ইসলামী পিআর ও গণভোটের সময় নিয়ে ফয়সালা চেয়েছে। এনসিপি বলেছে, বাস্তবায়ন পদ্ধতি ছাড়া অগ্রসর হওয়া যাবে না। তবে কয়েকটি বাম দল ছাড়া কেউই বলেনি, সনদে সই করবে না।

আগামীকাল শুক্রবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সনদ সই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে। গতকাল সকালে ইতালি সফর শেষে দেশে ফেরেন প্রধান উপদেষ্টা। সনদ সই নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দুপুরে যমুনায় তিনি ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। এর আগে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি রাজনৈতিক দল এবং জোটের সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক করবেন প্রধান উপদেষ্টা। দলগুলোকে দুই ঘণ্টার নোটিশে জরুরি বৈঠকে ডাকা হয়। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা সৃষ্টি হয়।

সূত্র জানিয়েছে, জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দলকে সনদ সইয়ে রাজি করাতে আজ বৃহস্পতিবার সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে দিতে পারে কমিশন। জামায়াত প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছে, সরকারের সম্মানে তারা সনদ অনুষ্ঠানে যাবে। সই করবে কিনা, এ সিদ্ধান্ত পরে জানাবে।

সনদে পটভূমি, সংলাপে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ঐকমত্য হওয়া ৮৪ সংস্কারের সিদ্ধান্ত এবং সাত দফা অঙ্গীকার রয়েছে। বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে– তা থাকছে না সনদে। ঐকমত্য কমিশন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করবে সিদ্ধান্ত নিতে। গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য হয়েছে। গণভোট কখন হবে, এ সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।
বিএনপি এবং সমমনা দলগুলো নির্বাচনের দিন গণভোট চায়। জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দল আগে গণভোট চায়। বিএনপি বিদ্যমান আইনে গণভোট চায়। জামায়াত, এনসিপি সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে সনদ কার্যকর চায়। কমিশনের বিশেষজ্ঞ প্যানেল একই পরামর্শ দিয়েছে। নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে বিএনপির বিপরীতে অবস্থান জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনের। তারা পুরো সনদেরই বাস্তবায়ন চায়। বিএনপি বলছে, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনসহ যেসব সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে না।

শুক্রবার সনদ সই, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন
রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের পর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দীর্ঘ প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সবাইকে এক জায়গায় এনেছে। সবাই মিলে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, যা গোটা বিশ্বের জন্য নজির। জাতি অভিভূত। কেউ কেউ জুলাই সনদ নিয়ে সন্দেহে ছিলেন। তবে এ ঘটনা দেশের মানুষ চিরদিন স্মরণ করবে।

সরকারপ্রধান বলেন, জুলাই সনদ সই গোটা জাতি উপভোগ করবে। যে কলম দিয়ে সনদে স্বাক্ষর করা হবে, তা জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে। জুলাই সনদ জাতির সম্পদ। যে দলিল আপনারা তৈরি করেছেন, তা হারিয়ে যাবে না। সনদে স্বাক্ষর মানেই সব শেষ– তা নয়। সনদের পরবর্তী কাজ যেন অব্যাহত থাকে।

ড. ইউনূস বলেন, ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য যা করা দরকার, সবই করা হবে। সবাই মিলে যেমন জুলাই সনদ করা হলো, তেমনি সবাই মিলে নির্বাচন করতে হবে।
বৈঠকের শুরুতে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সব দল সনদে সই করার জন্য দলীয় প্রতিনিধিদের নাম দিয়েছে। স্বাক্ষরের জন্য অঙ্গীকারনামার পাতা রাখা হবে। পরে তা

মূল সনদে সন্নিবেশিত করা হবে।
আলী রীয়াজ বলেছেন, ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। তবে কিছু বিষয়ে ভিন্নমত রয়েছে। সেগুলো সনদে উল্লেখ থাকবে। যাতে লেখা থাকবে, দলগুলোর কী কারণে ভিন্নমত রয়েছে।

বিএনপি চায় নোট অব ডিসেন্ট থাকতে হবে সনদে
বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের বিকল্প নেই জাতির সামনে। এমন পরিবেশ বজায় রাখতে হবে, যাতে ফ্যাসিবাদ আর জায়গা না পায়। নির্বাচন বিলম্বিত হলে সংকট বিস্তৃত হবে। জুলাই সনদ প্রায় প্রণয়ন হয়েছে। কিছু নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সে জন্য তো প্রধান উপদেষ্টা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। যদি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে সবাই একমত হতো, তাহলে তো এত সময় লাগত না।
সালাহউদ্দিন বলেছেন, সনদ বাস্তবায়নে নির্বাচিত সরকার দরকার। বিএনপিও সংসদের উচ্চকক্ষ চায়। তবে কিছু ছোটখাটো বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। সে জন্য এসব বিষয়ে গণভোটে প্রশ্ন যুক্ত করা হলে তা আর ব্যালট থাকবে না।

একই দিনে নির্বাচন ও গণভোটের পক্ষে দলের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেছেন, একই দিনে হলে আলাদা আয়োজন ও প্রস্তুতির দরকার নেই। যারা নির্বাচনের আগেই গণভোটের কথা বলছেন, সেটি তাদের অধিকার। তবে বিএনপির মনে হয়, সেটি নির্বাচন বিলম্বের অভিপ্রায়। কারণ, গণভোট জুলাই সনদের অংশ নয়। সে জন্য ঐকমত্য কমিশন সরকারকে সুপারিশ করবে। বিএনপি সরকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। জুলাই সনদে স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুত।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই সনদকে পরবর্তী সংসদেই আইনি ভিত্তি দিতে হবে।

নোট অব ডিসেন্ট চায় না জামায়াত
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ বৈঠকে বলেন, ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে দেশে নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যে গণভোট ও সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার দাবি জানাই।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, সনদে সই করব কিনা, এ সিদ্ধান্ত পরে হবে। তবে জামায়াত সনদ সই অনুষ্ঠানে যাবে। আদেশের মাধ্যমে সনদ কার্যকর এবং নির্বাচনের আগে গণভোটের বিষয়টি ফয়সালা করতে হবে।

জুলাই সনদের খসড়ায় বলা হয়েছিল, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের মতামতে সরকার গঠিত হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সনদে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১০৬ অনুচ্ছেদের নজির দিয়ে বিএনপি দাবি করছে, বর্তমান সরকার সাংবিধানিক এবং সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রয়েছে। জামায়াত বলছে, বর্তমান সরকার গণঅভ্যুত্থানে গঠিত। তাই সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা রয়েছে।

সনদ থেকে ১০৬ অনুচ্ছেদ বাদ দিলেও তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, সরকার আগে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক করুক; পরে স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকরে তারা চাপ অব্যাহত রাখবে।

গণভোটের স্পষ্ট দিনক্ষণ চায় এনসিপি
ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বৈঠকের আগে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যমুনায় গিয়ে দেখা করেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আগের রাতে তিনি আলী রীয়াজের সঙ্গেও দেখা করেন বলে এনসিপি সূত্র নিশ্চিত করেছে। নাহিদ প্রধান উপদেষ্টাকে জানান, সংবিধানের সমতুল্য আদেশে সনদ কার্যকর করে নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে। পরবর্তী সংসদের প্রথম অবিবেশনের গণপরিষদের ক্ষমতা থাকতে হবে। সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে এসব বিধান থাকতে হবে; নয়তো এনসিপি সই করবে না।
গতকালের বৈঠকের পর এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, সনদে থাকা নোট অব ডিসেন্ট কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা স্পষ্ট নয়। অঙ্গীকারনামায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নেই। গণভোটের প্রশ্ন কী হবে এবং দিনক্ষণ পরিষ্কার নয়। তবে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সন্তোষ জানিয়েছেন সনদ নিয়ে। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে। ঐকমত্য কমিশন যেভাবে জটিল কাজটি সমাধানের পথে এগিয়েছে, তা নজিরবিহীন।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। প্রচেষ্টাগুলো যাতে ব্যর্থ না হয়। অনেকের অনেক বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট বা দ্বিমত রয়েছে। এগুলো নিরসনের চেষ্টা করব। জাতি শঙ্কিত হয়, এমন কিছু যাতে আমরা না করি। প্রধান উপদেষ্টা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জাতি প্রত্যাশা করে।
ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন বলেন, বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ যেন সরকার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করে, বিশেষ করে গণভোটের সময় ঠিক করবে। একটি নোট অব ডিসেন্টও সনদে চাই না।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে অনেকেরই সন্দেহ ছিল। কিন্তু আমরা মাসের পর মাস সবার প্রচেষ্টায় একটা জায়গায় এসে আলোচনাটা প্রায় সম্পন্ন করার পর্যায়ে এসেছি।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দারের সঞ্চালনায় আরও বক্তৃতা করেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আব্দুল কাদের, জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি প্রমুখ। এ সময় কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম