জাতীয় ডেস্ক | বৃহস্পতিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | ৬৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, শত শত কোটি ডলারের চুরি করা সম্পদ করস্বর্গ ও ধনী দেশে পাচার ঠেকাতে কঠোর আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। গতকাল বুধবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) চেয়ার ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘অধিকাংশ সময় আমরা জানি, এ চুরি করা অর্থ কোথা থেকে আসছে। তবুও এটিকে আমরা বৈধ অর্থ স্থানান্তর হিসেবে মেনে নিই। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেই।’ তিনি জানান, বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে দক্ষিণের দেশগুলো থেকে চুরি করা সম্পদ পাচার ঠেকাতে। এ অর্থ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে করস্বর্গ ও উন্নত দেশে, যেখানে বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী এগুলোর বৈধতা দেয়। খবর বাসসের।
বিগত সরকারের কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘স্বৈরাচারের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১৬ বিলিয়ন (১ হাজার ৬০০ কোটি) ডলার পাচার হয়েছে।’ অধ্যাপক ইউনূস আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক নিয়মকানুনের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘এগুলো লুট করা অর্থ অফশোর দ্বীপপুঞ্জ ও ধনী দেশগুলোতে জমা রাখা সহজ করে দেয়।’
টিআই চেয়ার ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়ান চুরি করা সম্পদ উদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি এও বলেন, ‘আমাদের আরও কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ম ও এর কার্যকর প্রয়োগ দরকার।’
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বৈতনীতির নিন্দা জানিয়ে বলেন, তারা জেনেশুনে অবৈধ অর্থ জমা রাখছে। তিনি টিআইকে তাদের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো করা এবং বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়ন করে চুরি করা অর্থ পাচার বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক ফোরাম গঠনে সহায়তার আহ্বান জানান।
টিআই বাংলাদেশের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান বৈঠকে বলেন, টিআইর বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য শাখার যৌথ প্রচেষ্টায় শেখ হাসিনার সহযোগীদের অর্জিত সম্পত্তি জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।
শ্রম পরিবেশের উন্নতির প্রশংসায় জাপানের এমপিরা
শ্রম খাতবিষয়ক জাপানের একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নতির প্রশংসা করেছেন। তবে তারা আরও অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল ও কাউন্সিলরস হাউসের সদস্য মিচিহিরো ইশিবাশি বলেন, ‘শ্রম পরিবেশের উন্নতি আমরা স্বীকার করি। তবে এখনও আরও উন্নতির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’
গতকাল বুধবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সফররত জাপানের সংসদ সদস্যরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। মিচিহিরো ইশিবাশি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। সাক্ষাৎকালে তিনি ইপিজেডের ভেতর ও বাইরে কারখানা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলো ঘুরে দেখে ইতিবাচক শক্তি অনুভব করেছেন। ইশিবাশি বলেন, ‘আশা করি, জাপানের কোম্পানিগুলো অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে আরও বিনিয়োগ করবে।’
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জাপানকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে অভিহিত করে দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
এক লাখ তরুণকে জাপানে পাঠানোর পরিকল্পনা
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আমরা এক লাখ তরুণকে জাপানে পাঠানোর পরিকল্পনা করছি। তারা ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিষ্টাচার ও ইতিহাস শিক্ষায় প্রশিক্ষণ নেবে। এটি কেবল শুরু। ভবিষ্যতে আরও অনেকে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, তরুণদের জন্য এটি সৃজনশীলতা প্রকাশ ও অনুসন্ধানের এক অসাধারণ সুযোগ।’
প্রতিনিধি দলে ছিলেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভাইস সেক্রেটারি জেনারেল হনাকো জিমি, রিউজি সাতোমি, কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য কেনটা ইজুমি, স্বতন্ত্র এমপি মাকিকো দোগোমি, মাকি ইকেদা, মামোরু উমেতানি এবং ডেমোক্রেটিক পার্টি ফর দ্য পিপল-এর নির্বাহী বোর্ড সদস্য আতসুশি ওশিমা। সাক্ষাতে বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং এসডিজি-বিষয়ক সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সম্মেলন প্রস্তাব
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সাবেক ও বর্তমান আইনপ্রণেতাদের প্ল্যাটফর্ম আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) বাংলাদেশ, চীন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব করেছে। গতকাল বুধবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এপিএইচআরের একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে। এ সময় তারা এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
সাক্ষাৎকালে এপিএইচআরের সহসভাপতি ও মালয়েশিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, ‘দুটি কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা উচিত। একটি হলো রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল গঠনে আসিয়ান নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টা। আরেকটি হলো রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসিয়ান-বাংলাদেশ-চীন ত্রিপক্ষীয় উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্মেলন।’
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসিয়ানের সহযোগিতা চেয়ে প্রধান উপদেষ্টা বাংলাদেশকে এ আঞ্চলিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পুনরায় আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা আসিয়ানের খাতভিত্তিক সংলাপের সহযোগী হতে চাই। আমরা বারবার এ কথাই বলে আসছি। যেহেতু আমরা আসিয়ানের অংশ নই, তাই রোহিঙ্গা বিষয়টি আসিয়ানের আলোচনায় তুলতে পারছি না। অথচ এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সংকট সমাধান করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘আসিয়ানের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করুন, যা বর্তমানে নেই। আসিয়ানকে বিশ্বকে জানাতে হবে, আমরা যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছি।’ চার্লস সান্তিয়াগো বলেন, আসিয়ান সংসদ সদস্যরা ২০১৮ সালে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছিলেন এবং তখন থেকেই বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এ সময় মালয়েশিয়ার সংসদ সদস্য ওং চেন, ফিলিপাইনের সাবেক কংগ্রেস সদস্য রাউল ম্যানুয়েল এবং এপিএইচআরের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর চনলাথন সুপাইবুনলার্ডসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।