জাতীয় ডেস্ক | সোমবার, ০৪ আগস্ট ২০২৫ | প্রিন্ট | ৮৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় দিন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। দিনের শুরুটা ছিল সাবলীল, তবে দুপুর গড়াতেই তা রূপ নেয় গণবিস্ফোরণে। সেদিন একে একে যখন পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের গুলিতে প্রাণহানির খবর আসে, তখন জেগে ওঠে পুরো দেশ। শিক্ষার্থী থেকে দিনমজুর, পেশাজীবী থেকে সমাজকর্মী সবাই রাজপথে নেমে আসেন একযোগে। এদিন প্রাণ হারান ১০১ জন। রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝের বিশ্বাসের দেয়াল ভেঙে পড়ে। ৪ আগস্ট রাতেই নির্ধারিত হয়ে যায় সর্বেসর্বা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পরিণতি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল মূলত সরকারি নিয়ন্ত্রণহীনতা, গুম-খুন, নিয়োগে পক্ষপাত, দুর্নীতি এবং ভিন্নমতের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে। সেই আন্দোলন ক্রমেই রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। ৪ আগস্টের আগের দিন পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি ছিল ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’। বাস্তবতা পাল্টে যায় দ্রুত। ৪ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরফে ঘোষণা আসে– ৬ আগস্ট নয়, ৫ আগস্টেই হবে ‘মার্চ টু ঢাকা’। এ এক সিদ্ধান্তেই কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনঘণ্টা বাজে।
রাজধানীর শাহবাগে বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ গৃহযুদ্ধ সৃষ্টির লক্ষ্যে তাদের দলীয় ক্যাডারদের রাস্তায় নামিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক– বিজয় ছাড়া কিছু নয়। আমরা এখনও সময় দিচ্ছি। সরকার যদি সহিংসতা চালিয়ে যেতে থাকে, আমরা জানিয়ে দিতে চাই, আমরা গণভবনের দিকে তাকিয়ে আছি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, যদি আমার ভাইদের বুকে গুলি করা হয়, যদি আমার বোনেরা আর আহত হয়, তাহলে আমরা চুপ করে বসে থাকব না। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। যেখানেই আঘাত আসবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত তিনি শিক্ষার্থীদের শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এর পর ‘দফা এক, দাবি এক– শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে কাঁপে রাজপথ। সেদিন সকালে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনকারীদের ঢল শুরু হলেও তা ছিল অবরোধ কিংবা মিছিলে সীমাবদ্ধ। তবে দুপুরের পর একযোগে মাঠে নামে আওয়ামী লীগপন্থি সংগঠনের সদস্যরা। তারা শুরু করে রাস্তায় অবস্থানকারীদের ওপর হামলা। সংঘর্ষ হয় ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, মিরপুর, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। ৪ আগস্ট রাজধানীতে অন্তত ১২ জনের লাশ পড়ে। তাদের অধিকাংশকে মৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকার বাইরে লক্ষ্মীপুর, ফেনী, রংপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুরসহ অন্তত ২০টিরও বেশি জেলায় আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
রাজধানীতে আন্দোলনকারীদের কাঁধে ছিল প্রাণ হারানো মানুষের লাশ। ৪ আগস্ট বিকেল ৬টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা লাশ কাঁধে তুলে নেয়। জনতার স্রোতের মতো তারা এগিয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি পেরিয়ে শাহবাগের দিকে। স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ– ‘আমার ভাই মরল কেন, শেখ হাসিনা জবাব চাই’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।’ সেই মিছিল যখন শাহবাগ থানার সামনে পৌঁছে, পুলিশ দাবি করে, আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ছে। মুহূর্তেই ছোড়া হয় টিয়ার গ্যাসের শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় হাজার হাজার মানুষের মানবঢল।
দেশজুড়ে উত্তাল পরিস্থিতিতে বিক্ষুব্ধ জনতা আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি এবং দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ পরিস্থিতিতে ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় সরকার জারি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ইন্টারনেট। সব সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় মোতায়েন করা হয় আধাসামরিক বাহিনী। একই সঙ্গে ঘোষণা আসে তিন দিনের সরকারি ছুটি। কিন্তু এসবও আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়, বরং আরও বেড়ে যায় মানুষের ক্ষোভ।
৪ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, ধানমন্ডি-২৭, মিরপুর-১০, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বাংলামটর, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরকারদলীয় সমর্থক ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়। শাহবাগে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ভবনে আশ্রয় নেয়। এ সময় হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অন্তত ২৪টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। মিরপুর-১০ হয়ে ওঠে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল। সেখানে পুলিশ ও অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগ কর্মীরা অবস্থান নেয়। গুলির শব্দে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঢাকার বাইরে লক্ষ্মীপুরে অন্তত আট, ফেনীতে আট, রংপুরে চার, বগুড়ায় পাঁচ, সিলেটে চার, পাবনায় তিন, মুন্সীগঞ্জে তিন, মাগুরায় চার, কিশোরগঞ্জে তিন, কুমিল্লায় তিনজন নিহত হন। ফরিদপুরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) কার্যালয় ভাঙচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
৪ আগস্ট বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য একটি প্রস্তাব দেয়। এতে শিক্ষক, বিচারক, আইনজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া চালুর আহ্বান জানানো হয়। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে সেই সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে।
চারদিকে যখন আগুন, লাশ, কান্না আর ক্ষোভ– তখনও শেখ হাসিনা ছিলেন অনড়। গণভবনে তখন অবস্থান করছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ৪ আগস্ট রাত ১১টা নাগাদ পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায়, নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের সদস্যরা শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জয় শুরুতে ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখালেও পরে মাকে পদত্যাগের জন্য বলেন। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে আলোচনা, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব। শেখ রেহানাও বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেখ হাসিনা তখনও ভাবছিলেন গুলি করে আন্দোলন দমন সম্ভব। সেই ৪ আগস্ট রাতেই সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়– রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের বিপরীতে তারা সহিংস পন্থা নেবে না। আর তখনই শুরু হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগের প্রস্তুতি।