জাতীয় ডেস্ক | রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫ | প্রিন্ট | ৮২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে সারাদেশের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী যোগ দেন। বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন যানবাহনে আসেন তারা। ঢাকার বাইরে থেকে নেতাকর্মী বহন করে আনা বাস রাখা হয় রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে। সমাবেশস্থল থেকে দূরে এসব বাস থেকে নেমে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে যান নেতাকর্মীরা।
এতে গতকাল শনিবার রাজধানীর কোথাও যানজট, আবার কোথাও গণপরিবহন সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণ এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ঢাকা উত্তরের কোথাও রাস্তা অনেকটা ফাঁকা, কোথাও ছিল যানজট। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গণপরিবহন চলাচল ছিল তুলনামূলক কম। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। অবশ্য সমাবেশের কারণে যানজট ও জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টি হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুকের ভেরিফায়েড পেজে নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
দেশের বিভিন্ন জেলার নেতাকর্মীরা দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলার বাস ভাড়া করে ঢাকার সমাবেশে যোগ দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট জেলায় গণপরিবহন সংকট দেখা দেয়। গত শুক্রবার রাত থেকে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা রাজধানীতে আসতে শুরু করেন। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বহন করা যানের বাড়তি চাপে ঢাকা মহানগরের প্রবেশমুখের সড়কগুলোতে কিছুটা যানজট হয়। যানজটে আটকে পড়া লোকজন কেউ হেঁটে, কেউবা ব্যাটারিচালিত রিকশায় রওনা হন গন্তব্যে। গণপরিবহন কম থাকায় নগরবাসীকে ঝুঁকতে দেখা গেছে রিকশা-অটোরিকশার দিকে। এ সুযোগে রিকশাচালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন।
ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ যাত্রাবাড়ী ও হানিফ ফ্লাইওভারে সকাল থেকে গাড়ির চাপ ছিল। ফজলুর রহমান নামে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর গতকাল দুপুর ১২টায় দোলাইরপাড় থেকে মোটরসাইকেলে হানিফ ফ্লাইওভার হয়ে সেগুনবাগিচায় আসতে সময় লেগেছে প্রায় দুই ঘণ্টা। তিনি বলেন, ‘অন্যদিন বাসা থেকে বেরিয়ে সেগুনবাগিচায় আসতে সময় লাগে ২০ মিনিটের মতো। আজ (শনিবার) ধোলাইরপাড় থেকে যানজটে পড়তে হয়।’
সমাবেশ চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশেষ কারণ ছাড়া সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মিরপুর রোড, ফার্মগেট-উত্তরা এলাকার যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাংলামটর, মগবাজার, কারওয়ানবাজার, মৌচাক এলাকায় যানজট ছিল। একইভাবে রমনা থেকে মৎস্য ভবন হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তোপখানা রোড, পুরানা পল্টন, গুলিস্তান, দক্ষিণ দিকে চানখাঁরপুল এলাকায়ও দীর্ঘ সময় যানবাহন পথে আটকে পড়ে। যাত্রাবাড়ী থেকে চিটাগাং রোডে থেমে থেমে চলেছে গাড়ি।
ট্রাফিক রমনা বিভাগের বাংলামটর এলাকার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সংগ্রাম দেবনাথ বলেন, সমাবেশের কারণে বাংলামটর থেকে যানবাহন শাহবাগের দিকে যেতে দেওয়া হয়নি। এ সড়কের যানবাহন মগবাজারের সড়ক ব্যবহার করে। এ ছাড়া কারওয়ানবাজার মোড় থেকেও বিভিন্ন গাড়ি হাতিরঝিলের দিকে ঘুরিয়ে যেতে বলা হয়। সমাবেশে আসা নেতাকর্মীদের বাস শেরেবাংলা নগরের পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে রাখা হয়। তিনি আরও বলেন, সকাল ১০টার পর থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাংলামটর, মগবাজার এলাকায় যানজট ছিল।
পুলিশ জানায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নেতাকর্মীদের বহন করা গাড়ি যাত্রাবাড়ী, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, তেজগাঁও, বাসাবো, পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠ, পোস্তগোলার সার্ভিস লেনে, কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রজেক্টসহ বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়।
মেট্রোরেলেও ছিল যাত্রীর চাপ। প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছিল নেতাকর্মীর ভিড়। শাহবাগে কথা হয় পল্লবী থেকে আসা জামায়াতের তিন কর্মীর সঙ্গে। তাদের একজন ইসমাইল হোসেন জানান, তাঁর বাড়ি বর্ধিত পল্লবীতে। সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি মেট্রোরেলে এসে শাহবাগে নামেন। মেট্রোরেলে খুব চাপ ছিল। প্ল্যাটফর্ম থেকে মেট্রোরেলে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
ট্রাফিক রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, নেতাকর্মীর গাড়িগুলো দূরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে কিছু সড়ক ডাইভারশন দিয়ে যান চলাচল সচল রাখার চেষ্টা করেছি।
সারাদেশের চিত্র
জামায়াতের নেতাকর্মীরা ঢাকার সমাবেশে অংশ নিতে বগুড়ায় ২৮১ বাস ভাড়া করায় গণপরিবহন সংকটে সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। বগুড়ার সারিয়াকান্দির ভেলাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য গতকাল বিকেল ৪টায় শহরের ঠনঠনিয়া বাস টার্মিনালে যান। তখন ঢাকা যাওয়ার কোনো বাস পাননি তিনি। সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বসে থেকে বাস না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান।
আনোয়ারের মতো আরও অনেকেই ঢাকা যাওয়ার বাস না পেয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, বগুড়া থেকে প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী ঢাকার সমাবেশে যোগ দেন। যার জন্য বিপুলসংখ্যক পরিবহন প্রয়োজন হয়। ২৮১টি চেয়ার কোচ ভাড়া করা হয়। শুক্রবার রাতেই সেগুলো রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রা করে। এ ছাড়া ৩০টিরও বেশি মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকার ভাড়া করা হয়। খুলনা, কুষ্টিয়া, সিলেট রুটের এসি বাসগুলো নিয়মিত চললেও গতকাল ভোর থেকে ননএসি বাস ছিল কম। তবে খুলনা থেকে আন্তঃজেলার ১৮ রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
জামায়াতের সমাবেশে যোগ দিতে মেহেরপুর থেকে ৪৮টি বাস ছেড়ে যায় শুক্রবার রাতে। এত গণপরিবহন ভাড়াতে যাওয়ায় মেহেরপুরের সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আহসান হাবিব সোনা বলেন, মেহেরপুরে যে পরিমাণ বাস আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। আন্তঃজেলার বাসগুলো একদিন পরপর ট্রিপ পায়। জেলায় পরিবহনে কোনো সংকট নেই। যাত্রীরা যে অভিযোগ করেছেন তা ঠিক নয়। আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস মালিক সমিতির সভাপতি জহুরুল ইসলাম বলেন, মেহেরপুরে লোকাল বাস ২০০টি। এর মধ্যে মাত্র ২০টি বাস ঢাকায় গেছে। আন্তঃজেলা বাসে কোনো সংকট নেই।
সমাবেশে যাওয়ার জন্য নড়াইলে ৮৫টি বাস ভাড়া করা হয়। এ কারণে গতকাল ঢাকাগামী পরিবহনের সংকট তৈরি হয়। প্রতি ৪০ মিনিটে দুটি গাড়ি ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেলেও গতকাল দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর পর বাস ছেড়েছে।
পাবনা থেকে ঢাকায় দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল ছিল সীমিত। শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকাগামী মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। সকালে পাবনা বাসস্ট্যান্ড ছিল প্রায় বাসশূন্য। ফলে অনেক যাত্রীকে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। পাবনা সদর থেকে ২৫০টি বাস-মিনিবাস ও শতাধিক মাইক্রোবাস নিয়ে জামায়াত নেতাকর্মীরা ঢাকায় যান। এ ছাড়া পুরো জেলা থেকে কমপক্ষে ৫০০ যানবাহন ঢাকায় যায়।
শুক্র ও শনিবার ঢাকাগামী অনেক যাত্রী ঠিক সময়ে বাসের টিকিট পাননি। বাস কাউন্টারের কর্মীরা জানিয়েছেন, শনিবার ঢাকার সমাবেশের জন্য অধিকাংশ বাস ভাড়া করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ কারণে সাধারণ যাত্রীদের ওপর চাপ পড়েছে। জামায়াত ইসলামী সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে ৩০০ বাস ও একটি ট্রেন ভাড়া করে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার নেতাকর্মী সমাবেশে অংশ নেন। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ও উত্তর জেলা থেকে আরও ৩০০ বাস ঢাকায় যায়।
সৌদিয়া ও হানিফ এন্টারপ্রাইজের কাউন্টারের কর্মীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে তারা বাসের টিকিট দিতে হিমশিম খেয়েছিলেন। সাধারণ যাত্রীদের পাশাপাশি জামায়াতের কর্মীরাও যাত্রী ছিলেন; যার কারণে টিকিটের সংকট ছিল। শনিবার টিকেটের সংকট তুলনামূলক কম। তবে গাড়ি কম থাকায় চাপ আছে।
জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগরের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘যাত্রীর ওপর যাতে চাপ না পড়ে এ জন্য যেসব পরিবহনে যাত্রী কম থাকে তাদের কাছ থেকে আমরা বাস ভাড়া করেছি।’
দুই শতাধিক বাস নিয়ে সমাবেশে যোগ দিতে আসেন কুষ্টিয়ার কয়েক হাজার জামায়াত নেতাকর্মী। একদিনে দুই শতাধিক বাস রিজার্ভ করায় সাধারণ যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে কুষ্টিয়া-খুলনা, কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী রুটের যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, রামগঞ্জ, সদর ও কমলনগর থেকে অন্তত ১৫টি বাস ভাড়া করে জামায়াত। এতে সাধারণ যাত্রীরা বাস সংকটে পড়েন।
নোয়াখালী থেকে ৭৫টি বাস ভাড়া করে সমাবেশে যোগ দিতে যান জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। ফলে জেলায় যাত্রীবাহী বাস সংকট দেখা দেয়। সকাল থেকে যাত্রীরা বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে বাসের টিকিট না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান।
শনিবার দিনভর সিরাজগঞ্জ-ঢাকাগামী যাত্রীর চাপ তুলনামূলক কম দেখা গেছে। গতকাল সকালে সিরাজগঞ্জ থেকে শতাধিক বাস জামায়াতের নেতাকর্মীকে নিয়ে ঢাকায় যায়।