জাতীয় ডেস্ক | রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫ | প্রিন্ট | ১৬৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গতকাল শনিবার বিশাল সমাবেশ করে দলের শক্তি দেখিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বার্তা দিয়েছে, নির্বাচনের আগে মৌলিক সংস্কার করতে হবে। নির্বাচন হতে হবে ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন (পিআর) পদ্ধতিতে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদকে প্রতিহতের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে সমাবেশের সব বক্তাই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বিএনপির জন্যই সংস্কার আটকে আছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তাদের দল ক্ষমতায় যেতে পারলে চাঁদাবাজি-দুর্নীতি করবে না। কাউকে চাঁদা নেওয়ার, দুর্নীতির করার সুযোগও দেবে না। এমপি-মন্ত্রীরা প্লট-গাড়ি নেবেন না। জনগণের কাছে রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার হিসাব দেবেন।
সমাবেশে এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারা বক্তৃতা করেন। প্রথমবারের মতো জামায়াতের কর্মসূচিতে যোগ দেন হেফাজতে ইসলাম প্রতিনিধি। বক্তৃতা করেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহতরা।
লাখো নেতাকর্মীর জমায়েত
জুলাই গণহত্যার বিচার, মৌলিক সংস্কার, জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্র, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ সাত দফা দাবিতে সমাবেশ করেছে জামায়াত।
দলটি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, সাত দফা দাবিতে তাদের জাতীয় সমাবেশে সারাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি নেতাকর্মী ও সমর্থক আসবেন। দুপুর ২টায় সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও ভোর থেকেই সোহরাওয়ার্দীতে জমায়েত হতে শুরু করেন নেতাকর্মীরা। সকাল ৮টার দিকেই উদ্যানের বেশির ভাগ অংশ পূর্ণ হয়ে যায়।
বিকেল ৪টার দিকে সমাবেশ উদ্যান ছাপিয়ে পূর্বে মৎস্য ভবন মোড়, পশ্চিমে শাহবাগ, উত্তরে কাকরাইল মোড়, দক্ষিণে প্রেস ক্লাব হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল পর্যন্ত পৌঁছায়। শাহবাগ থেকে বাংলামটর পর্যন্ত রাস্তার একপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল নেতাকর্মীর জমায়েত। শাহবাগ থেকে কাঁটাবন এবং দোয়েল চত্বর সড়ক, সেখান থেকে শিক্ষা ভবন, প্রেস ক্লাব, পুরানা পল্টন হয়ে বিজয়নগর মোড় পর্যন্ত সড়কে ছিল একই দৃশ্য। এসব রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।
কুমিল্লার লাকসাম থেকে আসা জামায়াত কর্মী দিদারুল আমিন জানিয়েছেন, ১৪টি বাসে এক হাজার ২০০ নেতাকর্মী এসেছেন উপজেলা থেকে। বাস যাত্রাবাড়ীতে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে মিছিল করে এসেছেন সমাবেশস্থলে।
দুপুর ১২টার দিকে দেখা যায়, একের পর এক মিছিল আসছে সোহরাওয়ার্দীতে। আদালতের রায়ে নিবন্ধন ফিরে পাওয়া জামায়াতের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা এবং দলীয় লোগোসংবলিত পতাকা নিয়ে সমাবেশে আসেন। কয়েকটি মিছিলে ছিল জাতীয় পতাকা।
উত্তরবঙ্গ থেকে আসা নেতাকর্মীদের বাস রাখা হয় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। সেখান থেকে মিছিল করে আসা নেতাকর্মীদের কয়েকজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। ঢাকা শহরে পথ না চেনায় চলে যান পুরান এলিফ্যান্ট রোড হয়ে মন্ত্রিপাড়ার দিকে। কেন সমাবেশে এসেছেন– জানতে চাইলে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে আসা রজব আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি পালিয়ে যাওয়ায় এবার এলাকায় পাল্লার সম্ভাবনা বেশি। তাই চলে এসেছেন।’ পাশে থেকে এ সময় দুজন বলেন, চাঁদাবাজি, বালু নিয়ে মারামারি চাই না, তাই এসেছি।
সকাল সাড়ে ৯টায় ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক সংগঠনের গানের মাধ্যমে সমাবেশের প্রথম পর্ব শুরু হয়। ইসলামী সংগীত এবং জুলাই অভ্যুত্থানের গান পরিবেশ করে সংগঠনগুলো। এরপর হয় মঞ্চনাটক। সোহরাওয়ার্দীতে জোহরের নামাজের পর দুপুর ২টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে সমাবেশের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়।
নেতারা যা বললেন
বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের পর সভাপতির বক্তৃতা শুরু করেন জামায়াত আমির। কয়েক মিনিট বক্তৃতা করে তিনি অসুস্থ হয়ে ঢলে পড়েন মঞ্চে। জ্ঞান ফেরার পর আবারও বক্তৃতা করে ঢলে পড়েন। পরে মঞ্চে বসেই বক্তৃতা করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘একটি লড়াই হয়েছে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। আরেকটি লড়াই হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। জামায়াত যে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়বে, তার প্রথম প্রমাণ হচ্ছে …।’ এ কথা শেষ করার আগে তিনি পড়ে যান।
সেবাশুশ্রূষার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ সবাইকে নিয়ে গড়ব। আমরা কথা দিচ্ছি, আল্লাহর মেহেরবানি ও জনগণের ভালোবাসা নিয়ে জামায়াত যদি সরকার গঠন করে, তাহলে …।’ এ কথা শেষ করার আগেই আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে মঞ্চে বসে বলেন, বাংলার মানুষের মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত থাকবে। বলছিলাম, জামায়াত যদি আল্লাহর ইচ্ছা এবং জনগণের ভালোবাসায় দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পায়, তাহলে মালিক হবে না, সেবক হবে, ইনশাআল্লাহ। আজ ঘোষণা দিচ্ছি, লক্ষ জনতাকে সঙ্গে নিয়ে জামায়াত থেকে যারা আগামী দিনে এমপি-মন্ত্রী হবেন, তারা সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। ট্যাক্সবিহীন কোনো গাড়িতে চড়বেন না। নিজের হাতে কোনো টাকা চালাচালি করবেন না। কোনো এমপি ও কোনো মন্ত্রী যদি তাঁর নির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য বরাদ্দ পেয়ে থাকেন, কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষের কাছে তারা তার প্রতিবেদন তুলে ধরতে বাধ্য থাকবেন।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘চাঁদা আমরা নেব না, দুর্নীতি আমরা করব না। চাঁদা আমরা নিতে দেব না, দুর্নীতি সহ্য করব না। এই বাংলাদেশটাই আমরা দেখতে চাই। যুবকদের স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, তোমাদের সঙ্গে আমরা আছি।’
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস পাওয়া জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ভেবেছিল ফাঁসির মাধ্যমে জামায়াতকে স্তব্ধ করা যাবে, নিশ্চিহ্ন করা যাবে।’
নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আজব বাংলাদেশ! চাঁদা না দিলে জীবন শেষ! এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে চাঁদা চাইলে জীবন শেষ।’
সংস্কার আটকে যাওয়ায় বিএনপিকে দায়ী করে নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ‘বাইরে মিডিয়ার সামনে বলে সংস্কার চাই। ঐকমত্য কমিশনে গিয়ে বলে কিচ্ছু মানি না। পিআর পদ্ধতিতে টাকা দিয়ে ভোট কেনার সুযোগ নেই। পিআর পদ্ধতিতে স্বচ্ছ নির্বাচনের বিরোধিতা করা মানে তারা জাতির প্রত্যাশা নিয়ে সচেতন নয়।’
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে ডা. তাহের আরও বলেন, ‘আপনারা বলছেন পার্লামেন্টে বসে সংস্কার করবেন। কেন এমনটা মনে করছেন? আপনারা মনে করছেন আগামী নির্বাচনে আপনারা জিতবেন, নাকি দখল করবেন? নির্বাচনে দখলবাজি করতে দেবে না জনগণ। জনগণ চায় আগামী নির্বাচনে চাঁদাবাজ বিরোধীরা জিতবে, বাংলাদেশপন্থিরা জিতবে।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াত জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ পছন্দ করে না। ইসলামেও জঙ্গিবাদের স্থান নেই। দেশে যাতে জঙ্গিবাদ আর মাথাচাড়া দিতে না পারে। জামায়াত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সংগ্রাম করবে।’
দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে মজলুম সংগঠন জামায়াত।’ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বিএনপিকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘পিআরের দাবি না মানলে, রাজপথে আন্দোলনে আদায় করে ছাড়ব।’
অন্য দলের নেতারা যা বললেন
‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ সব দলকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বললেও বিএনপি এবং এবি পার্টিকে সমাবেশে দাওয়াত করেনি জামায়াত। ডা. তাহের কে জানান, পিআরের পক্ষে থাকা দলগুলোকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, নির্বাচনে উচ্চকক্ষে যারা পিআর চায় না তারা ফ্যাসিবাদী হতে চায়। এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, মুজিববাদী সংবিধানকে একপাশে রেখে বাংলাদেশপন্থি বাংলাদেশ সম্ভব নয়। মুজিববাদীদের ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুস আহমাদ বলেছেন, নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতেই হতে হবে। আগামী নির্বাচনে ইসলাম এবং দেশপ্রেমিক শক্তির ভোট এক বাক্সে যেতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গণঅধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে টেকসই করতে শাসনতান্ত্রিক এবং পরিবর্তনের আওয়াজ মানুষ উঠিয়েছে; সেই অনুযায়ী শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন না করে আপনারা নির্বাচনের দিকে হাঁটবেন না।
জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, জামায়াত মানুষ গড়ার বিশ্ববিদ্যালয়।
ছাত্রলীগের নির্যাতনে নিহত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যার বিচার ছয় বছরেও না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁর বাবা বরকত উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ভারতীয় আধিপত্য, আগ্রাসন এবং তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের কিছু অবৈধ চুক্তির বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল বলে আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়।’
জুলাই অভ্যুত্থানে পা হারানো শাহ আলম বলেন, জুলাইয়ে শেখ হাসিনা সরকার চিকিৎসা দেয়নি। দিয়েছিল জামায়াত। সরকারকে আগে জুলাইয়ের বিচার করতে হবে। পরে ভোট হবে।
যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিতে শহীদ ইমাম হাসান তাইমের ভাই রবিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, পুলিশের আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন কী করে ক্ষমা পায়?
সমাবেশে উপস্থি ছিলেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবুল হোসেন ও রমজান আলী। বক্তৃতা করেন শহীদ আলী রায়হানের বাবা মোখলেস উদ্দিন, জুলাইযোদ্ধা বায়তুল মমিন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রেদওয়া আবিল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী এম এস মুস্তাফিজুর রহমান।
বক্তৃতা করেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেলিম উদ্দিন, শিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সাবেক সভাপতি সাদিক কায়েম প্রমুখ।