শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

অনাহার: পশ্চিমা আধিপত্যবাদের পুরোনো কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক   |   বুধবার, ২০ আগস্ট ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ১১১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

অনাহার: পশ্চিমা আধিপত্যবাদের পুরোনো কৌশল

গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অ্যাগেইনস্ট ফুড ক্রাইসিসের হিসেবে বিশ্বে চলতি বছর অন্তত ৩০ কোটি মানুষ অপুষ্টি ও অনাহারে মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে গাজায় খাদ্যবঞ্চিত রাখা হয়েছে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে। কঙ্গোতে মার্চ পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাবে দুই কোটি ৭৭ লাখ মানুষ ভয়াবহ খাদ্য সংকটে রয়েছে। সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সেখানে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সুদানে দুই বছর ধরে চলা সংঘাতের অন্তত দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের অনেকেই মারা গেছেন অনাহার ও অসুখে। দেশটির প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা প্রয়োজন।

এমনই সময়ে গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রক্ষিত জরুরি ত্রাণ সহায়তার ৫০০ টন খাদ্য বিনষ্ট করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউএসএইড বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গুদামে পড়ে আছে মার্কিন ৬০ হাজার টন জরুরি ত্রাণ সহায়তার খাদ্য। একদিকে খাদ্য মজুদ অন্যদিকে খাদ্যাভাবে অনাহার- এ দৃশ্য আসলে একটি পুরোনো ছকেরই অংশ, যার শেকড় রয়েছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও পুঁজিবাদের গভীরে।

কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে খাদ্য ও পানি থেকে বঞ্চিত করে রাখা পশ্চিমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। এই পশ্চিমা আধিপত্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ক্ষুধা জিইয়ে রাখার বিষয়টি তাদের সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও পুঁজিবাদী একটি হাতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর উত্থান ঘটেছে মুনাফার জন্য খাদ্যসম্পদ আটকে রাখা এবং বিপাকে পড়া জনগোষ্ঠীর ওপর অনাহারকে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে।

পশ্চিম গোলার্ধজুড়ে পশ্চিম ইউরোপীয়দের সম্পদ লুণ্ঠন শুধু পুঁজিবাদের ভিত্তি গড়ে দেয়নি, এটি একই সঙ্গে ক্ষুধা, অপুষ্টি ও বঞ্চনাকে অধিকৃত জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের কৌশল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

ষোড়শ থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ট্রান্স-আটলান্টিক দাস বাণিজ্য, আফ্রিকানদের দাস বানানো এবং আদিবাসী জনগণকে জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিত করার মাধ্যমে ইউরোপের রাজন্যদের কোষাগারগুলো সম্পদে ভরে উঠেছে। জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োজিতদের মাঠে বা খনিতে কঠিন পরিশ্রমে বাধ্য করা এবং পর্যাপ্ত খাবার ও পানি না দেওয়া ছিল নিয়মিত বিষয়। ফলস্বরূপ, অপুষ্টি, অসুখবিসুখ ও মৃত্যু যেন এই শ্রমিকদের নিয়তিতে পরিণত হয়েছিল। সাম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, ১৪৯২ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ আদিবাসী মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

মানব ইতিহাসে প্রতিটি পরাশক্তিই কোন না কোন সময়ে অন্য কোন জাতিরাষ্ট্রকে দখল ও সম্পদ লুণ্ঠনের প্রক্রিয়ায় তার খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় আক্রমণ করেছে। পশ্চিমারা ১০৯০ সালের দিকে ধর্মের নামে প্রথম ক্রুসেডের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের যাত্রা শুরু করে। ওই সময় তারা পবিত্র ভূমি (বর্তমান দিনের সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন) অবরুদ্ধ করে মুসলমান ও ইহুদিদের অনাহারে থাকতে বাধ্য করে।

পশ্চিমের বাইরে, ১৭৭০ সালে বাংলায় মহাদুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইউরোপীয় বন্দরে খাদ্য সরবরাহে অধিক মনযোগ এবং বঙ্গের কৃষকদের ওপর শাস্তিমূলক কর আরোপের ফলে এ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯০৪ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে বর্তমান নামিবিয়া ও তানজানিয়ায় জার্মানরা ৭০ হাজার মানুষকে হত্যা করে। উপনিবেশ স্থাপন করতে গিয়ে আড়াই লাখের বেশি আদিবাসীকেও হত্যা করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ২০০ কোটি মানুষের আহার যোগানোর মতো পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন করে। আর বিশ্বব্যাপী যত খাদ্য উৎপাদন হয় তাতে বছরে এক হাজার কোটি মানুষকে খাওয়ানো সম্ভব। কিন্তু সম্পদের তৃষ্ণা এবং দুর্গতের কাছে খাদ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সুপরিকল্পিত অনীহা পরিস্থিতি জটিল করে রেখেছে। ক্ষুধা এখনও পশ্চিমাদের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার। ভূরাজনৈতিকভাবে, যতদিন ক্ষুধাকে এভাবে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে বিশ্বে ততদিন শান্তি আসবে না।

ডোনাল্ড আর্ল কলিন্স: ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান ইউনিভার্সিটির শিক্ষক
আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপে ভাষান্তর: আদনান মনোয়ার হুসাইন

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম