শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

জামায়াতের অল্প ব্যবধানে হারা আসন নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বনাম পরিসংখ্যান

জাতীয় ডেস্ক   |   রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জামায়াতের অল্প ব্যবধানে হারা আসন নিয়ে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বনাম পরিসংখ্যান

নির্বাচনের পরদিন সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশ কিছু ভাষ্য ছড়িয়ে পড়ে। এগুলোর বেশিরভাগেই অভিযোগ তোলা হয়, ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মাধ্যমে বিভিন্ন আসনে জামায়াতের প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। দায়ী করা হয়, ‘ডিপ স্টেট’কে।

যেমন একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেন, ‘ডাক্তার শফিক (শফিকুর রহমান) কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিল? পিরোজপুর-২-তে দেলোয়ার হোসেন সাইদির (দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী) ছেলেকে মাত্র ৭০ ভোটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুলনাতে মিয়া গোলাম পরোয়ারকে (পরওয়ার) মাত্র ২০০০ ভোটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। জামাত (জামায়াত) ৫০০০ এর কম ভোটে হেরেছে এমন আসনের সংখ্যা ৫৩টি। মূলত এই ৫৩টি আসনে কারচুপি করে হারানো হয়েছে জামাতকে। জামাত প্রকৃত পক্ষে ১৩৫টি আসনে জিতেছে। কিন্তু ডিপ স্টেট সংখ্যা কমিয়ে ৭০-৮০ টি দিতে চাচ্ছে।’

আরেক ব্যবহারকারী লিখেন, ‘…৫৭টি আসনে জামায়াত প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপি প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান মাত্র ৭০টি থেকে ২, ৩, ৪, ৫ হাজার , নির্বাচন কতটা প্রতিদ্ধন্দিতা হয়েছে এই সব আসন গুলি দেখলে বুজা যায়!’ (বানান অপরিবর্তিত)

ডিসমিসল্যাব বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এমন অন্তত এক ডজন পোস্ট ও মন্তব্য সংগ্রহ করেছে, যেগুলোর মূল বক্তব্য হলো, কারচুপি বা ষড়যন্ত্র না হলে আরও অনেক বেশি আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা জিততে পারতেন। এমন দাবির সত্যতা যাচাইয়ে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত আসনভিত্তিক ফলাফল থেকে বিজয়ী ও মূল প্রতিদ্বন্দ্বির প্রাপ্ত ভোট সংগ্রহ করে তাদের মধ্যকার ব্যবধান গণনা করে ডিসমিসল্যাব।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৫ হাজার ভোটের কম ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে মোট ২২টি আসনে, ৫৩টিতে নয়। এসব আসনে ব্যবধান ৩৮৫ ভোট থেকে ৪ হাজার ৭০২ ভোটের মধ্যে। কিন্তু সব মিলিয়ে ৫ হাজারের নিচে থাকা আসনের সংখ্যা ২২টির বেশি নয়।

এই ২২টি আসনের ফল জোটভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ১১টি আসনে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ৯টিতে। একটি করে আসনে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অর্থাৎ, ৫ হাজারের কম ব্যবধানের আসনগুলোর অর্ধেকেই জামায়াতসমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন।

এই তালিকায় জামায়াত জোট সরাসরি পরাজিত হয়েছে ৯টি আসনে। এসব আসনের প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন এনসিপির আব্দুল আহাদ, একজন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ওমর ফারুক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক। বাকি ৬ জন জামায়াতে ইসলামীর যার মধ্যে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও আছেন।

সবচেয়ে কম ব্যবধানের পাঁচটি আসনের মধ্যে মাদারীপুর-১-এ ব্যবধান ৩৮৫ ভোট, সিরাজগঞ্জ-৪-এ ৫৯৪ ভোট। এই দুটি আসনেই জয়ী হয়েছেন জামায়াত বা তাদের মিত্র প্রার্থী। অন্যদিকে কক্সবাজার-৪, চট্টগ্রাম-১৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে যথাক্রমে ৯২৯, ১০২৬ এবং ১০৬১ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছে বিএনপিসমর্থিত প্রার্থীরা। অর্থাৎ, সংকীর্ণ ব্যবধান উভয় জোটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

জোটভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব আসনে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা পরাজিত হয়েছে সেখানে মোট ব্যবধানের যোগফল ২৬ হাজার ৯০৭টি। এতে করে গড় পরাজয়ের ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯৯০ ভোট। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা যেসব আসনে হেরেছে, সেখানে মোট ব্যবধানের যোগফল ৩০ হাজার ৮২০, গড় পরাজয়ের ব্যবধান প্রায় ২ হাজার ৫৬৮ ভোট। অর্থাৎ, স্বল্প ব্যবধানের আসনগুলোর মধ্যে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের গড় পরাজয়ের ব্যবধান ভোটের হিসাবে বিএনপি জোটের তুলনায় বেশি।

২৯৭টি আসনের ফলাফলকে ভোটের ব্যবধান অনুযায়ী ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজালে দেখা যায়, সবচেয়ে কম ব্যবধানের ৫০টি আসনের পরিসর ৩৮৫ ভোট থেকে ৯ হাজার ৫৮১ ভোট পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ৫০টি আসনের মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২৪টিতে। বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২২টিতে। তিনটিতে জিতেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটি আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

অর্থাৎ, ৫০টি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের ভেতরে কোনো একক জোটের একচেটিয়া প্রাধান্য দেখা যায় না; বরং বিএনপি জোটের প্রার্থীরাই বেশি হেরেছেন।

এছাড়া, খুলনা-৫ আসন নিয়ে ভাইরাল পোস্টে নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। প্রদত্ত ফল অনুযায়ী, ওই আসনে বিজয়ী ও নিকট প্রতিদ্বন্দ্বির ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৬০৮ ভোট। সংখ্যাটি ৫ হাজারের নিচে হলেও দাবিতে উল্লেখিত ভোটসংখ্যার সঙ্গে তা মেলে না। একাধিক পোস্টে বলা হয়েছে, পিরোজপুর-২ আসনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলেকে মাত্র ৭০ ভোটে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দাবিও সঠিক নয়। ব্যবধানটি বরং ৮ হাজার ২৮৮ ভোটের। ফলাফল অনুযায়ী, বিজয়ী আহম্মদ সোহেল মনজুর পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট এবং শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট।

প্রতিবেদনের শুরুতে যে পোস্টের কথা বলা হয়েছে, সেটি বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। একাধিক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে ‘ডাক্তার শফিক কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিল?’ ক্যাপশনের পোস্টটি পাওয়া যায়।

প্রচারটি শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। একাধিক ব্যবহারকারী এই তত্ত্বটিকে বিভিন্ন পোস্টের নিচে মন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন, ‘জবিয়ানস’ নামের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট ছিল- ‘জামাত শিবিরের কয়েকজন দেখলাম অভিযোগ করছে, মিডিয়া ক্যু করে তাদের আমীর এবং অন্যান্যদের রেজাল্ট চেঞ্জ করা হচ্ছে…’। সেখানে একজন ব্যবহারকারীকে ‘ডাক্তার শফিক কেন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং মেনে নিল’ শীর্ষক লেখাটি মন্তব্য হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়।

একটি গণমাধ্যমের একটি ফেসবুক পোস্টের বিষয়বস্তু ছিল জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের দলীয় কার্যালয়ে হাজির হওয়া। সেখানেও কমেন্ট সেকশনে অন্তত দুজন ব্যবহারকারী একই দাবি করেন। এছাড়া, ‘তানভীর স্যার’ নামের একটি ভেরিফায়েড পেজ থেকে পোস্ট করে বলা হয়, ‘যদি চরমোনাই পীর সাহেবও তার দল নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করতেন তবে হাতপাখা প্রতীকের ভোট একত্রিত হয়ে জোটের পক্ষে আরও ৪০-৫০টি আসনে জয়লাভ করা যেতো।’ এই পোস্টেও দাবি করা হয়, ‘পিরোজপুর-২ আসনে দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ছেলে মাত্র ৭০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। খুলনায় মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রায় ২০০০ ভোটে হেরেছেন। জামায়াত ৫০০০ ভোটের কম ব্যবধানে হেরেছে, এমন আসনের সংখ্যা প্রায় ৫৩টি।’ কিন্তু এমন দাবির কোনোটিই সত্য নয়।

‘তানভীর স্যার’ পেজের পোস্টের লেখা আবার একজন ব্যবহারকারী কমেন্ট করেন ‘নাটশেল টুডে’ পেজের একটি পোস্টে। প্রায় একই দাবি দেখা যায়, ‘সাংবাদিক মনিরুজ্জামান’ নামের প্রোফাইল থেকে দেওয়া একটি পোস্টেও। এই পোস্টে জামায়াতের আমিরের মঞ্চে অসুস্থ হয়ে পড়ার সময়ের একটি দৃশ্যের ছবি যুক্ত করে লেখা হয়, ‘৬৮ টা আসন+ ৫০০০ কম মার্জিনের ৫০ আসন মানে দেশের ২০০+ উপজেলায় জামায়াতের নিয়ন্ত্রণ থাকবে যারা ৫ আগস্টের পর জামায়াতে আসছিলা তোমরা আবার ফিরে যাও শফিক দাদুই চেঞ্জমেকার’ (বানান অপরিবর্তিত)।

(অনলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণা প্লাটফর্ম ‘ডিসমিসল্যাব’-এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয় ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম