জাতীয় ডেস্ক | শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ১২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক ধরে উত্তরের জনপদ বগুড়ায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বৈপরীত্যের এক অদ্ভুত ছবি। রাস্তার দুই ধারে রঙিন সাইনবোর্ড, রাজনৈতিক ব্যানার আর প্রার্থীদের উজ্জ্বল হাসিমুখের পোস্টার। কিন্তু গাড়ির চাকার নিচেই অনুভূত হয় খানাখন্দে ভরা সড়কের জীর্ণদশা। শহরের প্রবেশমুখ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়–দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা সমস্যাগুলো আজও সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।
চাকচিক্যের আড়ালে জীর্ণ শহর
বনানী, চারমাথা থেকে সাতমাথা–এটিই বগুড়া শহরের হৃৎপিণ্ড। ব্যস্ত বাণিজ্যিক এই শহরে ব্যাংক, হাসপাতাল আর নামি কোচিং সেন্টারের ভিড় থাকলেও পরিকল্পিত নগরায়ণের চিহ্ন মেলা ভার। ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকান আর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিশৃঙ্খল দৌরাত্ম্যে পথচারীর হাঁটার জায়গা নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বড় অংশ তলিয়ে যায় হাঁটুপানিতে। সাতমাথা এলাকার চা দোকানি আব্দুল হালিম আক্ষেপ করে বলেন, ‘শহর বড় হইছে ঠিকই, কিন্তু ড্রেনগুলো আগের মতোই। বৃষ্টির সময় দোকানের সামনে থইথই পানি থাকে। ভোটের আগে নেতারা আসেন, পরে আর কারও দেখা মেলে না।’
রাজনীতির সূতিকাগার, কিন্তু উন্নয়নের আক্ষেপ
বগুড়া রাজনৈতিকভাবে বরাবরই প্রভাবশালী জেলা। বড় বড় জাতীয় নেতার উত্থান এই মাটি থেকেই। স্থানীয়দের মতে, রাজনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় উন্নয়ন এখানে অনেক পিছিয়ে। মালতীনগর এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তারের কথায়, ‘বৃষ্টি হলে ঘর থেকে বের হওয়া যায় না, আবার শুষ্ক মৌসুমে ধুলার জন্য বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে পারি না।’ উত্তরবঙ্গের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনেও দালাল ও যানজটের বিশৃঙ্খলা নিত্যদিনের সঙ্গী।
এক সময় বিস্কুট, মেটাল ওয়ার্কশপ আর কৃষিভিত্তিক শিল্পের জন্য বগুড়াকে উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হতো। বর্তমানে সেই জৌলুস ফিকে হয়ে আসছে। বিসিক শিল্পনগরীর অনেক প্লট এখন ফাঁকা বা ধুঁকছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা ও নীতিসহায়তার অভাবে নতুন উদ্যোক্তারা পিছু হটছেন। খাদ্য প্রক্রিয়াজাত কারখানার মালিক আব্দুল কাদেরের মতে, শিল্প টিকিয়ে রাখতে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতিসহায়তা।
নির্বাচনী ময়দান ও প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির ডালি
বগুড়ার ৭টি আসনেই এখন তুমুল প্রচারণা। সামাজিক মাধ্যম আর ভিডিওবার্তার মাধ্যমে প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন ডিজিটাল ময়দান। বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনে মূল ইস্যু নদীভাঙন ও কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য। বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের ভোটাররা উন্নয়নের কাজের হিসাব চাইছেন, তরুণদের দাবি কর্মসংস্থান। বগুড়া-৫ ও ৭ (শেরপুর-ধুনট-গাবতলী) আসনে কৃষিভিত্তিক শিল্পপার্ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন গুরুত্ব পাচ্ছে।
বগুড়া-৬ (সদর) আসনটি ভিআইপি আসন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখানে প্রার্থী হওয়ায় দেশবাসীর নজর এই আসনের দিকে। প্রার্থীরা এখানে যানজট ও ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের টোপ দিচ্ছেন ভোটারদের।
ভোটারদের হিসাবের খাতা
বগুড়ার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৬৭২ জন ভোটারের মধ্যে এবার আর কেবল ‘মার্কা’ দেখে ভোট দেওয়ার প্রবণতা নেই। বিশেষ করে তরুণ ভোটাররা কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছ রাজনীতির প্রত্যাশী। শিবগঞ্জের তরুণ ভোটার তানভীর হোসেনের ভাষায়, ‘আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি শুধু রাজনীতি করবেন না, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন।’ বিশ্লেষকদের মতে, এবার বগুড়ায় আবেগ বা দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও এলাকার জন্য তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে।
বগুড়া বিএনপির জন্য এক প্রতীকী দুর্গ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরসূরি এবং তারেক রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ এই লড়াইকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তবে বহুমুখী এই প্রতিযোগিতায় শেষ হাসি কে হাসবে, তা নির্ভর করছে সাধারণ মানুষের ‘টিকে থাকার প্রশ্নের’ সঠিক উত্তর কে দিতে পারছেন তার ওপর।