জাতীয় ডেস্ক | শনিবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
প্রকাশনা শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষা এবং একটি কার্যকর ও সফল বইমেলা আয়োজনের স্বার্থে ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর সময়সূচি পরিবর্তনসহ চার দফা দাবি জানিয়েছে দেশের সৃজনশীল প্রকাশকরা। পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর বইমেলা আয়োজনের দাবি জানিয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন তারা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে বইমেলার তারিখ ও সময় নির্ধারণ নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রকাশকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রমজান মাসে বইমেলা আয়োজন করা হলে তা প্রকাশনা শিল্পের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে।
গত ২৭ জানুয়ারি পাঠানো স্মারকলিপিতে প্রকাশকরা উল্লেখ করেন, বিগত দেড় বছরে দেশে বইয়ের বিক্রি ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। সর্বশেষ বইমেলাতেও বহু প্রকাশক তাদের বিনিয়োগ তুলতে পারেননি। অথচ বইমেলার পুরো আয়োজনের আর্থিক ঝুঁকি এককভাবে প্রকাশকরাই বহন করেন। লেখক ও পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে প্রকাশকদের ভূমিকা উপেক্ষা করলে তা দেশের সামগ্রিক জ্ঞান ও সৃজনশীলতা চর্চার ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে সতর্ক করেন তারা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, বইমেলার সময় পরিবর্তনের দাবি কোনো একক বা গুটিকয়েক প্রকাশকের নয়; বরং এ বিষয়ে প্রকাশকদের মধ্যে বিরল ঐকমত্য রয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)-এর সভাপতির কাছে ২৬২ জন সৃজনশীল প্রকাশক স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে একই দাবি জানানো হয়েছে। বাপুসের পক্ষ থেকেও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের মাধ্যমে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
প্রকাশকদের যুক্তি অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির পরপরই রমজান ও ঈদের ছুটি শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ফলে শিক্ষার্থীরা—যারা বইমেলার অন্যতম প্রধান ক্রেতা—ঢাকায় থাকবেন না। পাশাপাশি ঈদের আগে সাধারণ মানুষ পোশাক ও অন্যান্য কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকেন, বই কেনার জন্য বাজেট কমে যায়। এতে পাঠক উপস্থিতি ও বই বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্মারকলিপিতে আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে বলা হয়, বাংলাদেশে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও গণগ্রন্থাগারের মাধ্যমে একজন প্রকাশকের নির্বাচিত কয়েকটি শিরোনামের মাত্র ৩৫ থেকে ৭০ কপি বই কেনা হয়, যা প্রকাশকদের বিনিয়োগ ও ঝুঁকির তুলনায় নগণ্য। অথচ নরওয়েতে সরকার প্রতি বছর নতুন বইয়ের ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কপি কিনে লাইব্রেরিতে বিতরণ করে। যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় লাইব্রেরিতে বই পাঠের জন্যও লেখক-প্রকাশকরা রয়্যালটি পান। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও সরকার ন্যূনতম ৩০০ কপি বই কিনে প্রকাশকদের সুরক্ষা দেয়।
এ ছাড়া আসন্ন নির্বাচন, প্রেস ও বাইন্ডিং খাতে চাপ, কাগজের তীব্র সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে অল্প সময়ে মানসম্মত বই ছাপানো কঠিন হয়ে পড়বে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
একুশের চেতনা প্রসঙ্গে প্রকাশকরা বলেন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা শুধু ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবতা উপেক্ষা করে প্রতিকূল সময়ে মেলা আয়োজন করলে তা একুশের মূল চেতনার পরিপন্থী হবে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশকরা সরকারের কাছে চার দফা দাবি উত্থাপন করেছেন। দাবিগুলো হলো— পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’ আয়োজন ; এবারের বইমেলায় স্টল ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ ; শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বই কেনায় সরকারি প্রণোদনা বা ভাউচার চালু ; সরকারি বই ক্রয় নীতির সংস্কার করে প্রতিটি মানসম্মত বইয়ের ন্যূনতম ৩০০ কপি ক্রয়ের ব্যবস্থা।
স্মারকলিপিতে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ঈদের পর বইমেলা আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানিয়ে বলা হয়, প্রকাশক ও সরকার পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোদ্ধা। সরকার প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তারা।
স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন প্রকাশক মেছবাহউদ্দীন আহমদ, এ.কে নাসির আহমেদ, মাজহারুল ইসলাম, মনিরুল হক, সৈয়দ জাকির হোসাইন, মাহরুখ মহিউদ্দীন ও মাহাবুব রহমান।