শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertise with us

ডিএসসিসির স্থাপনাতেই ‘মশার কারখানা’, কর্মকর্তারা ঘুমে

জাতীয় ডেস্ক   |   মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৯১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ডিএসসিসির স্থাপনাতেই ‘মশার কারখানা’, কর্মকর্তারা ঘুমে

নির্মাণাধীন শেরেবাংলা মালেক শাহ মার্কেটের চারপাশ টিন দিয়ে ঘেরা। কাজ বন্ধ প্রায় আট বছর! এর উত্তরে গুলিস্তান ফ্লাইওভার, দক্ষিণে মুরগিপট্টির একাংশ আর পশ্চিমে কাপ্তানবাজারের দ্বিতীয় কমপ্লেক্স। নির্মাণাধীন ওই মার্কেটের বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতে গজিয়ে উঠেছে কচুরিপানা; ভাসছে ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন, মরা মুরগি। এর ওপরে ভনভন করছে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা। অবকাঠামোটি এখন পরিণত হয়েছে এডিস, কিউলেক্স ও অ্যানোফিলিস মশার প্রজননকেন্দ্রে।

বছরের শুরু থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রতি শনিবার মশক নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অথচ ডিএসসিসির নিজস্ব এই ভবনেই জন্ম হচ্ছে অগণন মশা। তা নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের কোনো হেলদোল নেই। রাজধানীতে মশার উপদ্রব এতটাই লাগামহীন, মশা মারতে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁর কক্ষে টেবিলে রেখেছেন ইলেকট্রিক র‍্যাকেট (মশা মারার যন্ত্র)।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ হাজার ৭৯১ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২৪৯ জন। গত সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ৭৬ জনের। গতকাল সকাল ৮টার আগের গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৯৪২ জন; মারা গেছেন চারজন। মৃত্যু তালিকার একজন ডিএসসিসি এলাকার।

নির্মাণাধীন শেরেবাংলা মালেক শাহ মার্কেটের একটি দোকানের মালিক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মার্কেটে ৪০০ দোকান হওয়ার কথা। বেজমেন্ট নির্মাণের পর দীর্ঘদিন মার্কেটের কাজ বন্ধ। সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও তাপসের দ্বন্দ্বে আটকে ছিল নির্মাণকাজ। সরকার বদলের পরও কাজ শুরুর জট খোলেনি। এখন সেটি নোংরা পানি, কচুরিপানা, পলিথিন, মশা ও আবর্জনায় ভরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে লার্ভা নিধনে ছিটানো হয় না ওষুধ। পরিদর্শন কার্যক্রমও নেই। বর্ষা চলে গেলেও জমে আছে পানি। মাঝখানে একবার কচুরিপানা পরিষ্কার করলেও সেটি ছিল লোক দেখানো। মার্কেটের সামনের সড়কে বিকেলের পর ভাসমান দোকান চালান রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর মশার যন্ত্রণা সহ্য করা যায় না। কয়েল জ্বালিয়ে বসি।

পুরান ঢাকা নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ইকবাল কবির বলেন, ডিএসসিসি নিজের স্থাপনারই খোঁজ রাখতে পারছে না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে পারছে না। জবাবদিহি না থাকায় সিটি করপোরেশন যেনতেনভাবে চলছে।

পুরান ঢাকার কলতাবাজারে থাকেন নাঈম শেখ। তিনি বলেন, বর্ষা শেষে মশার উপদ্রব বেড়েছে। আগের মতো স্প্রে করতে দেখা যায় না। এলাকায় আগে কাউন্সিলরের লোকজন এসে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করতেন। মসজিদে ইমাম খুতবার আগে এডিস মশার প্রজনন স্থান নিয়ে বয়ান দিতেন। এ বছর এর কিছুই নেই।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকার কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২৪৭/১ ভবনের ব্যবস্থাপক মিল্লাত হোসেন বলেন, ভবনের নিচ থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত মশায় ভরে গেছে। মশার কয়েল জ্বালানো ছাড়া বসা যায় না। আগে মাঝেমধ্যে মশার ওষুধ ছিটিয়ে দিয়ে যেত। অক্টোবরে আজ পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের কারও মুখ দেখা যায়নি।
ডিএনসিসির ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মাহফুজুল হক বাবলু বলেন, অফিস শেষ করে যখন বাসায় ঢুকি, একটু দাঁড়ালেই মশার উৎপাত শুরু হয়। কবে মশককর্মী ওষুধ ছিটিয়ে গেছেন, মনে নেই।

কাফরুল থানার ওসি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আগে মাঝেমধ্যে মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য কর্মীরা আসত। এখন আর চোখে পড়ে না। আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মশার ওষুধ ব্যবহার করি।

জানতে চাইলে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যপাড়া জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুর রহিম বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটিয়ে গেছে। এরপর আর তাদের দেখা যায়নি। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর করপোরেশনের পক্ষ থেকে জুমার নামাজের পর মসজিদে লিফলেট বিতরণ করে এলাকাবাসীকে সচেতন করা হলেও এবার সেটি হয়নি।

জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, হাসপাতালে আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মশক নিধনের কাজ প্রতিদিন করে থাকি। যদিও এটি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ। আমাদের এই হাসপাতাল ডিএনসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। আমার জানামতে, এক মাসের মধ্যে মশক নিধনে হাসপাতালের আশপাশে কাউকে দেখা যায়নি।

ডিএনসিসির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের মশককর্মী সানাউল্লাহ বলেন, আমাদের অফিস থেকে প্রতিদিন সকালে এক লিটার অকটেন ও পাঁচ লিটার ম্যালাথিন দেয়। এ দুটো মিলিয়ে আমরা ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধন করে থাকি। সব মিলিয়ে ৪০০ মিটার পর্যন্ত স্প্রে করা যায়।

এই ওয়ার্ডের মশক সুপারভাইজার মুসার হোসেন রায়হান বলেন, ওয়ার্ডে ১৯ মশককর্মী আছেন। তারা সকালে লার্ভিসাইডিং ও বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইটিং স্প্রে করে থাকেন।

কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, সিটি করপোরেশন আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কীটতত্ত্ববিদদের কোনো পরামর্শ নেয় না। নিজেদের মতো কার্যক্রম চালায়। অভ্যুত্থানের পর উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিও আগের পথেই হাঁটছেন। আমার বসবাসস্থল বনশ্রীর আশপাশের এলাকা বর্জ্য দিয়ে ভর্তি। খালি প্লটে বাঁশ আর কাঠ পড়ে আছে মাসের পর মাস। এসব নিয়ে করপোরেশনের ভ্রুক্ষেপ নেই।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা মশক নিধন কার্যক্রমের সঙ্গে প্রতিটি ওয়ার্ড ও অঞ্চলে প্রচারাভিযান চালাচ্ছি। এ বছর আক্রান্তের হার কম হওয়ায় মশকের জন্মস্থান নিধনে বিশেষ অভিযান নেই।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস বলেন, আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য ছাড়াও প্রতিটি হাসপাতালে সপ্তাহে দুদিন রোগীর তথ্য সংগ্রহ করছি। তাদের বসবাসের ঠিকানা ধরে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছি।

Facebook Comments Box
আরও
Advertise with us

ফলো করুন nykagoj.com-এর খবর

সম্পাদক
আফরোজা ইসলাম
কন্ট্রিবিঊটিং এডিটর
মনোয়ারুল ইসলাম