প্রবাস ডেস্ক | শনিবার, ০৮ জুন ২০২৪ | প্রিন্ট | ১২৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
ঈদ এলে আমাদের সবারই স্বপ্ন বাড়ি যায়। সবাই মনে মনে ভাবি স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার। কিন্তু আসলেই কি তাই? প্রবাস জীবনে ঈদের দিন অনেককেই দেখেছি নীরবে নিভৃতে দিনটি পালন করতে। অব্যক্ত ব্যথা বুকে নিয়ে অনেককেই দেখেছি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে। অনেককেই মুখ ফুটে বলতে শুনেছি- এই দিনটিতে অন্তত একা থাকতে চাই!
কী বিচিত্র ক্ষণিকের এই জীবন! এখনো মনে হয়, আব্বার হাত ধরে নামাজে যাচ্ছি ঈদগাহ ময়দানে। মনে হয়, নামাজটা শেষ হলেই বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মেতে উঠব আড্ডায়। ঈদের আগের রাতটা যেন শেষই হতো না।
বাংলাদেশে এখন মধুমাস। অর্থাৎ, আম-কাঁঠালের মাস। প্রকৃতি চাপা গরমে আম-কাঁঠাল পাকাবে। অন্যদিকে, রাতের অবিরাম মুষলধারা বৃষ্টিস্নাত ঘুম পাড়াবে। শুধু ফলে নয়, প্রকৃতিও যেন তার অবয়বে ছড়াবে মধুর মাস।
আম-কাঁঠালের এই দিনগুলোতে বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে। বাড়িতে বলতে গেলে মা প্রায় সব ধরনের গাছই লাগাতেন। এরমধ্যে বাড়ির উঠানেই কয়েক ধরনের আমগাছ, কাঁঠাল, আমড়া, চালতা, পেয়ারা, বিলাতি গাবগাছ। তেঁতুল আর লিচু গাছ খুব সম্ভবত বিলুপ্ত। সম্ভবত বলার অর্থ প্রতি বছর যা দেখে আসি, পরের বছর তা আর দেখি না। শুনেছি তেঁতুল গাছে অনেক ভূত থাকে। ভূতেরা কখন জড়ো হয়, তা দূর প্রবাসে থেকে জানার কোনো উপায় নেই।
কঠিন বাস্তবতার অভিবাসী জীবন, সুযোগ পেলেই মন চলে যায় বাড়ির আঙিনায়। আমার মতো হাজারো অভিবাসীর মন নিজের অজান্তেই ছুটে যায় সেখানে। খুঁজে ফিরে বাল্যকালের সব কিছুই। যে জীবন বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলেনি, ঝড়ের রাতে আম কুড়ায়নি, বর্ষাকালে মাছ ধরেনি, গভীর রাতের ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ শোনেনি, মায়ের বকুনি খায়নি, বাবার রক্তচক্ষু দেখেনি, সে জীবনের সার্থকতা কোথায়?
ছুটিতে বাড়ি আসব এই আনন্দেই আব্বা-আম্মার প্রায় এক সপ্তাহ ঘুম হতো না। ছেলে কী খাবে, কী কী পছন্দের তালিকায় সব রেডি করার একটা প্রস্তুতি চলতো। শুধু তাই নয়, বেডরুম, বিছানার চাদর, বাথরুম, বাড়ির উঠান আর আঙিনায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার এক ভিন্ন মাত্রা যোগ হতো। প্রকৃতিকেও হাতছানি দিয়ে বলতে শুনেছি, ‘আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি!’ কী আনন্দ ছিল আকাশে-বাতাসে!
অথচ কী আশ্চর্য! কী নির্মম এই প্রকৃতি! এই আমার ছুটিকেই প্রকৃতি এখন প্রচণ্ড ভয় পায়। চায় না আমার সুখ-দুঃখকে ভাগ করে নিতে। আকাশে-বাতাসে পড়ে কালো মেঘের ছায়া। কালবৈশাখীর দ্রুত প্রস্থানই যেন প্রত্যাশার বিন্দুতে পরিণত হয়। আব্বা-আম্মার সাথে ঈদের সেই দিনগুলো ভীষণ মিস্ করি।
দুশ্চিন্তা-হতাশার হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই ঈদ। আর পাব না সেই ঈদ, পাব না সেই শৈশব। পারব না ফিরে যেতে আমার সেই সোনালী অতীতে, পারব না বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যেতে। সময়ের সাথে সাথে অনেক আপনজন চলে গেছেন, রেখে গেছেন স্মৃতি।
স্মৃতির জানালায় ঈদের দিনটা বড় কষ্ট হয়ে দেখা দেয় প্রবাস জীবনে। মনে করিয়ে দেয় শৈশবের বেড়ে ওঠার দিনগুলো। মনে করিয়ে দেয় বাবা-মার সাথে ঈদের আনন্দ। প্রবাসে ঈদ আনন্দের সময়ে বাবা-মাকে খুব মিস করি।
মন কেবলই ছুটে যায় বাড়ির আঙিনায়, খুঁজে ফেরে হাসিমাখা মমতাময়ী মা-বাবা আর স্বজনদের। না দেখার, না পাওয়ার, স্বজন হারানোর অব্যক্ত ব্যথা আর বিষাদ বুকে চেপেই কাটে প্রবাসীর ঈদ। তারপরও স্বজনরা ভালো থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা প্রবাসীদের।