ডেস্ক রিপোর্ট | রবিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৩ | প্রিন্ট | ১৭৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় মন্ত্রী এমপিদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা। তারা অভিযোগ করেছেন, অনেক এলাকায় মন্ত্রী এমপিরা দলের বাইরে নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। তারা দলীয় নেতাকর্মীদের খুব একটা মূল্যায়ন করেন না। এ ছাড়া সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও তারা নেতাকর্মীদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেন না। এসব কারণে অনেক জায়গায় দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ অসন্তুষ্ট। যা আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। গত শনিবার গণভবনে আয়োজিত বিশেষ বর্ধিত সভায় সারা দেশ থেকে পাঁচ হাজারের মতো প্রতিনিধি অংশ নেন। সভায় উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের ৪৩ জন নেতা বক্তব্য রাখেন। এতে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
তারা বলেন, পক্ষপাতপূর্ণভাবে টিআর-কাবিখা দিয়ে অনেক এমপি এলাকায় বদনাম করছেন এবং তারা মাই লীগ তৈরি করেছেন। শেখ হাসিনার মনোনয়ন পেয়ে অনেকে শেখ হাসিনার চেয়ে নিজেকে জনপ্রিয় মনে করেন বলেও মন্তব্য করেছেন তৃণমূলের অন্তত দুজন নেতা। তৃণমূল নেতাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কিছু কিছু এমপি টিআর-কাবিখা নিয়ে অনিয়ম করেন, দুর্নীতি করেন।
টাকা খেয়ে কোনো কোনো এমপি বিএনপি-জামায়াতের জন্য চাকরির সুপারিশ করেন। ফলে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। তৃণমূলের একাধিক নেতা আওয়ামী লীগের অন্তঃকলহ এবং বিভক্তির জন্য এমপিদের ভূমিকাকে দায়ী করেছেন। এইসব এমপিদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের নেতারা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতিকে আহ্বান জানান।
প্রায় ৭ ঘণ্টার আলোচনা শেষে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী দলের নেতাদের উদ্দেশ্যে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, সভায় যেসব অভিযোগ এসেছে ভবিষ্যতে এমন যাতে আর না ঘটে সবাইকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনে যেসব নেতাকে দলীয় প্রার্থী করা হবে তাদের জন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কে মনোনয়ন পেলো আর কে পেলো না তা নিয়ে বিতর্ক করা যাবে না। এ সময় তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হাত তুলে নেতাদের সমর্থন জানাতে বললে উপস্থিত সবাই হাত তুলে সমর্থন জানান।
বৈঠকে জেলা, উপজেলা, মহানগর ও পৌর শাখা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। এ ছাড়া স্থানীয় এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, উপদেষ্টা পরিষদ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও বৈঠকে অংশ নেন। শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। পরে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা সূচনা বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বৈঠকে বেশ কয়েকটি জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ভারপ্রাপ্ত থেকে পুরো দায়িত্ব দেয়ার ঘোষণা দেন।
বিশেষ বর্ধিত সভার মধ্যদিয়েই মূলত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এতে টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দিক নির্দেশনা দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু দিক নির্দেশনাই নয়, আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন কীভাবে দেয়া হবে বা কারা মনোনয়ন পাবেন না সে সম্পর্কেও তিনি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। দলীয় নেতারা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সম্পর্কে কড়া বার্তা দিয়েছেন। দলে ভিন্নমতাবলম্বীদের কোনো জায়গা থাকবে না বলে স্পষ্ট সতর্কবার্তা জানিয়েছেন।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি, বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের বক্তব্য এবং বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নেতাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী ওই বৈঠক আহ্বান করেন। এদিকে বৈঠকের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে গণমাধ্যমকর্মীদের অনুষ্ঠানস্থল ছাড়ার অনুরোধ জানানো হয়। বিশেষ বর্ধিত সভায় পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আলমগীর হোসেন প্রথমে বক্তব্য রাখেন। তারপর বরগুনার আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মতিয়ার রহমান বক্তব্য রাখেন। এ পর্বটি পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী আলমগীর হোসেন বলেন, ছাত্রলীগ থেকে আওয়ামী লীগে যারা এসেছেন আগামী নির্বাচনের মনোনয়নে তাদের গুরুত্ব দিতে হবে। তারাই দলের জন্য ডেডিকেটেড।
এসময় তিনি আগামী নির্বাচনে পটুয়াখালীর সবক’টি আসন নৌকাকে উপহার দেয়া সম্ভব বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমার জেলার অন্য কোনো জায়গায় তেমন দলীয় সমস্যা নেই। কিন্তু বাউফলে কেন যে নিজেদের মধ্যে মারামারি, হাতাহাতি হয় তা বুঝি না। আমি মনে করি কেন্দ্র থেকে বাউফল নেতাদের ঢাকায় ডাকতে হবে। সমস্যার সমাধান করতে হবে। এ সময় বর্ধিত সভায় উপস্থিত বাউফলের কয়েক নেতা এর মৃদু প্রতিবাদ জানান। তারা বক্তব্যের মাঝেই উচ্চস্বরে কথা বলতে থাকেন। এরপরই বক্তব্য রাখেন বরগুনার আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজবি-উল কবির। তিনি বলেন, নৌকার সঙ্গে যারা প্রতারণা করে তাদেরকে সমমর্যাদা দেয়া হয়। এতে দল সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে নৌকা জয়যুক্ত হবে বলে প্রত্যাশার কথা জানান তিনি। পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সাদাত বলেন, যারা বিএনপি করে তারাও এখন স্বীকার করে যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। নিজেদের কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী নির্বাচনে নৌকাকে জয়ী করা খুব সহজেই সম্ভব।
বর্ধিত সভায় গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লা খান বলেন, আমি হলে ভালো, অপরে হলে খারাপ, এই রাজনীতি চলছে। এই সাইজ করার রাজনীতি চলছে। আমরা অনেকেই এই সাইজ করার রাজনীতি করি। এটা বন্ধ করতে হবে। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বর্ধিত সভা থেকে কী ধরনের বার্তা পেলেন জানতে চাইলে বাগেরহাট সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সভাপতি সরদার নাসির উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, আগামী নির্বাচনের জন্য কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় সভাপতি। আমরা তার কাছ থেকে একটাই বার্তা পেয়েছি। তাহলো- আগামী নির্বাচনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে কাজ করে জিতিয়ে আনতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ থেকে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। জেলা ও উপজেলার অনেক নেতা মানবজমিনকে বলেন, সভায় আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য শোনার পর সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, সবাই মিলে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের একমাত্র শক্তি জনগণ। আমরা কারও কাছে মাথানত করি না। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাকে মনোনয়ন দেবে তাকে জয়যুক্ত করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বর্ধিত সভায় উপস্থিত দলের নেতারা হাত তুলে দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই আহ্বানের প্রতি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।