ডেস্ক রিপোর্ট | মঙ্গলবার, ২৫ জুলাই ২০২৩ | প্রিন্ট | ২৮২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
কেউ কি তাকে দেখেছেন হাসি মুখ ছাড়া? গোমরা মুখে! কিংবা কারো সাথে ঝগড়া করতে দেখেছেন? সম্ভবত উত্তর আসবে একটাই -না। অন্তত ২০ বছরের পরিচয়ে আমি নিজে এমনটি কখনো দেখিনি। তিনি তৌফিকুর রহমান ফারুক। সোমবার ২৪ জুলাই অনন্তের ডাকে সাড়া দিয়ে হারিয়ে গেলেন সবার মাঝ থেকে।
এই সবার সাথে মিষ্টি করে কথা বলতেন, সে জন্য তাকে লোকে বলতো-মিডা ফারুক। কারো সাথে রুঢ় আচরণ বা কঠিনভাবে কথা বলেছেন এমনটি কেউ দেখেনি।
কাজ করতেন একটা রেস্টুরেন্টে।বেশিরভাগ সময় ভোর রাতে কাজে যেতেন। লাঞ্চের সময় কাজ করতেন।ফলে কাজের শেষেও হাতে থাকতো অফুরন্ত সময়। সে সময়টা কাজে লাগাতেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের জন্য।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কসের শুরু থেকেই সম্পৃক্ত। সবশেষে সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করেছেন। প্রবাসী বিশ্বনাথ কল্যান সমিতির সহসভাপতি, বাংলাদেশি আমেরিকান ডেমোক্রেটিক সোসাইটিসহ এমনি নানা সংগঠনের সাথে তিনি ছিলেন। কমিউনিটির জন্য কাজ করেছেন মন প্রাণ উজার করে।
পার্কচেস্টার কনডোমিনিয়ামে পরিচিত কেউ বাসা নিতে চাচ্ছেন কিন্তু কাগজপত্রের জন্য কোয়ালিফাই করতে পারছেন না। মুশকিল আসান হয়ে ফারুক তার কাগজপত্র দিয়ে তাকে উদ্ধার করলেন।
হোটেলে কাজ করতেন ফারুক। হোটেলে কাজ পেতে অনেককেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। যা অন্য অনেকে করতে চাইতেন না। ব্রঙ্কস আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম রব্বানী বলেন, আমি সহ অনেকেই হোটেল ইন্ড্রাস্ট্রিতে কাজ করছি ফারুকের সহায়তায়।
আমার নিজের কথাই বলি। একদিন জ্যাকবি হাসপাতাল থেকে বাসায় ফিরছি। বাস থেকে নেমেছি মরিস পার্ক এবং হোয়াইট প্লেইনস স্টপেজে।এখানে নতুন একটা এরাবিয়ান রেস্টুরেন্ট ওপেন হয়েছে। নতুন রেস্টুরেন্টের খাবার চেখে দেখা আমার একটা হবি। ঢুকলাম। নতুন কিছু এরাবিয়ান ধাঁচের খাবার খেয়ে বিল দিয়ে বেরিয়ে আসছি। রাস্তা থেকে দেখে দৌড়ে ভিতরে ঢুকে আমার হাত ধরে হিড় হিড় করে টেনে ম্যানেজারের সামনে নিয়ে বল্লেন, উনি কি বিল দিয়েছেন? ম্যানেজার বল্লেন হ্যাঁ। ফারুক বল্লেন, এখন থেকে উনি আসলে কোন বিল নেবেনা, খাতায় লিখে রাখবে ইনি আমার ভাই।’
তাকে বল্লাম, এটা কি হলো!
বল্লেন,এই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার আমার ভাড়াটিয়া। তাই তাকে বলে রাখলাম।আমার বাড়ির পাশে রেস্টুরেন্টে খেয়ে আপনি বিল দেবেন তা কি করে হয়!
এই হলো ফারুক ভাই।
দু সপ্তাহ আগে মনে হলো দেখে আসি ফারুক ভাই কেমন আছেন।বাসার কাছে গিয়ে কল দিলাম।কারন বাসার নাম্বারটা জানা নেই।ফোন বাজছে কেউ ধরছেনা। কল দিলাম তার প্রতিবেশি আমাদের কমন বন্ধু শেবুল খান মাহবুবকে। উনি ফোন ধরেই বল্লেন-জানেননা, ফারুকের শরীরতো খুব খারাপ! আইনস্টাইন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
ছুটলাম ওখানে। কি যে খুশী হলেন দেখে! দুহাত জড়িয়ে ধরে একটা ছবি তুল্লেন।দেখলাম পেট ফুলে গেছে।ফুলে গেছে পা থেকে উপরেও।কেমন জানি ভয় হচ্ছিলো।
ব্যস্ত ছিলাম এই কদিন। আমার অনুজপ্রতিম সামিউলের সহধর্মিনি ফারজানা আশরাফির দুটো কিডনিই ড্যামেজ হয়ে এলমহার্স্ট হাসপাতালের আইসিইউ তে।ক’দিন ধরেই ছুটছি ওখানে।গতকালই সে রিলিজ হয়ে বাসায় গেলো।ভেবেছিলাম সময় করে একবার ফারুক ভাইকে দেখে আসবো। কিন্তু তার আগেই আজ দুপুরে বাংলাদেশ সেসাইটি অব ব্রঙ্কসের সাধারন সম্পাদক মামুন ইসলামের ফোন- ফারুক ভাই আর নেই।
ছুটলাম পার্কচেস্টার জামে মসজিদে। ততক্ষণে মরদেহ ধোয়ানো হয়ে গেছে। কফিনে সাদা কাপড় পরে শুয়ে আছে আমাদের প্রিয় ফারুক ভাই। কী শান্ত স্নিগ্ধ চেহারা-মনে হচ্ছিলো যেন বলে উঠবেন, হাবিব ভাই কি খাবেন?
ফারুক ভাই আর কোনোদিন আমাকে চায়ের অফার করবেন না।
রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারকে ডেকে আর কোনদিন বলবেনা-এর নাম হাবিব ভাই, এর কাছ থেকে কোনো দিন খাবার বিল নেবেনা। আবদার নিয়ে কোনদিন আমাকে এসে বলবেন না- হাবিব ভাই অমুকের কাগজপত্র নেই।তাকে কিন্তু কনডোমিনিয়ামের একটা বাসা ম্যানেজ করে দিতেই হবে।
চোখটা জলে ভিজে ঝাপসা হয়ে আসছিলো।
আচ্ছা,ভালো মানুষগুলো পৃথিবী ছেড়ে এমনি করে এত তাড়াতাড়ি চলে যায় কেন?