ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০২৩ | প্রিন্ট | ২২২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
কানাডার সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। আগামী সপ্তাহে অটোয়ায় দেশটির সঙ্গে ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি)’র আওতায় হবে ওই বৈঠক। সচিবের সঙ্গে যাবে একটি প্রতিনিধি দল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশেষত গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং অত্যাসন্ন নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ করার বিষয়ে পশ্চিমাদের দৃশ্যমান চাপের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সফরটি হচ্ছে। তাছাড়া ভারত ও কানাডার মধ্যে বিরাজমান অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে উভয়ের বন্ধু ‘বাংলাদেশ’ এর কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অটোয়া সফরসূচি চূড়ান্ত হয়েছে। সেগুনবাগিচা অবশ্য বলছে, দেশীয় রাজনীতি কিংবা ভারত-কানাডা অস্বস্তি- কোনোকিছুর সঙ্গেই পররাষ্ট্র সচিব তথা বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের অটোয়া সফরের সম্পৃক্ততা নেই। অনেক দিন ধরেই ফরেন অফিস কনসালটেশন এর জন্য উপযুক্ত সময় খোঁজা হচ্ছিল। উভয়ের সম্মতিতে ২৭শে অক্টোবর কাঙ্ক্ষিত সেই বৈঠকের সময়ক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে।
সচিবের সফর প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মানবজমিনকে জানিয়েছেন, আসন্ন বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে জোর দেবে বাংলাদেশ। কানাডার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পায় বহু বছর ধরে। এ ছাড়াও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, চীনামাটির বাসন, চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, টেবিলওয়্যার ও রান্নাঘরের জিনিসপত্র রপ্তানি হয়।
বাণিজ্যের জন্য সম্ভাবনাময় কানাডায় ফার্মাসিউটিক্যালস রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এফওসিতে এসব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। কানাডা থেকে বিশেষায়িত ‘ক্যানোলা অয়েল’ আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ। সয়াবিন নির্ভরতা কমাতেই ক্যানোলা তেল আমদানির ওই চিন্তা। এরইমধ্যে সরকারের তরফে ওই তেলের আমদানি শুল্ক কমানোর কাজ শুরু হয়েছে। কানাডা থেকে আইটি খাতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এর আগে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি এফআইপিএ সই করতে হবে। নির্বাচনের আগে ওই চুক্তির সম্ভাবনা না থাকলেও চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা এগিয়ে রাখতে সম্মত হয়েছে উভয়ে।
উল্লেখ্য, চীনসহ অনেক দেশের সঙ্গেই ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রোটেকশন এগ্রিমেন্ট বা এফআইপিএ সই করেছে কানাডা, যাকে বিনিয়োগের রক্ষাকবচ হিসাবে বিবেচনা করে অটোয়া। বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব এবং সুরক্ষার আলোচনায় দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আসন্ন নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে কথা তুলতে পারে কানাডা। এরইমধ্যে সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় ঢাকাস্থ কানাডিয়ান কূটনীতিকরা নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা হবে কি-না সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কানাডা বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন দেখতে চায়। এ দেশের মানুষ যেন তার পছন্দের নেতৃত্ব নির্বিঘ্নে নির্বাচন করতে পারে সেই সুযোগ অবারিত করতে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি অব্যাহতভাবে আহ্বান জানাচ্ছে দেশটি। যেটি যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কানাডার অন্য মিত্রদেরও চাওয়া। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের নাগরিকরা যেন নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার জন্য খোলাখুলিভাবে কথা বলতে পারেন, বিতর্ক এবং সংলাপ করতে পারেন সেই সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সরকার তথা কর্তৃপক্ষের প্রতি উন্মুক্ত আহ্বান রয়েছে কানাডার। পররাষ্ট্র সচিব এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় এটি পুনর্ব্যক্ত করা হতে পারে, এমনটা আভাস দিয়ে অটোয়ার এক কূটনীতিক বলেন, কানাডা বৈশ্বিক মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, জীবনের নিরাপত্তা, আইনের শাসনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।
বৈঠকে অন্য যেসব বিষয় স্থান পেতে পারে- কানাডার সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমার কর্তৃক নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত এক মিলিয়নের অধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয় তথা ভবিষ্যতের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় তুলবে বাংলাদেশ। এরইমধ্যে কিছু রোহিঙ্গাকে স্থায়ীভাবে নিজের দেশে নিয়ে গেছে কানাডা। যদিও এই সংখ্যা খুবই কম। বাংলাদেশ চায় এই সংকটের টেকসই সমাধান। এজন্য তাদের আদি নিবাস রাখাইনে নিরাপদভাবে প্রত্যাবাসনে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। বিষয়টি যেন কানাডা বিশ্ব সম্প্রদায়ের বিবেচনায় উত্থাপন করে এবং চীনের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠেয় প্রত্যাবাসন নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার যে উদ্বেগ রয়েছে তা নিরসনে সহায়তা করে ঢাকা সেটিই চাইবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং মানবিক ত্রাণ সহায়তায় কানাডার আরও সক্রিয়তার অনুরোধ করবে ঢাকা। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার কার্যক্রমে গাম্বিয়াকে আর্থিকভাবে সহায়তার অনুরোধও জানানো হবে। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি নূর চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়ার অনুরোধ করা হবে। ঢাকাস্থ কানাডীয় হাইকমিশন থেকে ভিসা প্রদান সংক্রান্ত কনস্যুলার সেবা দিল্লিতে স্থানান্তরের ফলে শিক্ষা, ব্যক্তিগত সফর, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য এবং সরকারি কাজে কানাডা ভ্রমণে বাংলাদেশি ভিসা প্রার্থীগণ যে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন তা নিরসনের তাগিদ দেয়া হবে। পুনরায় এই সেবা ঢাকায় চালুর জন্য বৈঠকে অনুরোধ জানানো হবে। বাংলাদেশ ও কানাডা দু’দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সরকারি এবং বেসরকারি স্টেক হোল্ডারদের সমন্বয়ে ‘ব্লু রিবন প্যানেল’ নামে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ক’বছর আগে। এর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে জোর দেয়া ছাড়াও বাংলাদেশে বিভিন্ন রপ্তানি খাত, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদুৎ ও জ্বালানি খাতে কানাডার আরও বিনিয়োগ আহ্বান করা হবে।
উল্লেখ্য, কানাডা-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫১ বছর পার হয়েছে। প্রতিনিয়তই দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ বেড়েছে। ১৯৭২ সালে কানাডা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। সেই থেকে ব্যবসা, বাণিজ্য, প্রযুক্তিসহ আরও অনেক কিছুতে দুই দেশের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। যা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। কানাডায় থাকা লক্ষাধিক বাংলাদেশি-কানাডিয়ান উভয়ের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। দেশটিতে আরও বেশি করে বাংলাদেশিরা যেন যেতে পারেন, বিশেষ করে পড়াশোনায় এবং দক্ষ নাগরিকদের বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে জোর দিবে ঢাকা। কানাডা ঘোষিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়েও কথা হবে। সেই কৌশলপত্রের সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানের সামঞ্জস্যতা খতিয়ে দেখা হবে। কানাডা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য ২০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। যা থেকে বাংলাদেশও উপকৃত হতে পারে। বাংলাদেশে গম, ডাল জাতীয় খাদ্যদ্রব্যের একটা বড় অংশ আসে কানাডা থেকে, এটি আরও সহজলভ্য করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।